×

প্রথম পাতা

হঠাৎ বেড়েছে বোমা আতঙ্ক

Icon

আজিজুর রহমান জিদনী

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ বেড়েছে বোমা আতঙ্ক

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গত এক সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনায় কেউ নিহত না হলেও বোমা নিষ্ক্রিয়করণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলো শক্তিশালী ছিল। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে উগ্রবাদ কি তা হলে ফের মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে? বিশ্লেষকরাও বলছেন, দেশে যে পরিস্থিতি বিদ্যমান এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে থাকে উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসবাদীরা। এছাড়াও গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের জঙ্গিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তাদের সবার অবস্থা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ধারাবাহিক এসব ঘটনার পেছনে কারা বা তাদের উদ্দেশ্য কী- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না দিলেও পুলিশ বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে ও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি আতঙ্ক নেই। এছাড়া কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, এটা সত্য ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক অপরাধীই জামিনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকই রয়েছেন যারা উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগেও অভিযুক্ত ছিলেন। জেল ভেঙে পালানোর মতোও ঘটনা দেখেছি আমরা। এখন তারা কোথায় বা কী করছেন- আমরা এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হয়তো সেভাবে জানে না। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নয়, আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি হত্যাসহ নানা অপরাধের পারদ ঊর্ধ্বমুখী। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এসব সুযোগ জঙ্গিরা নিতে পারে। এছাড়াও আমরা গণমাধ্যম মারফত জেনেছি কয়েকজন বাংলাদেশি পাকিস্তানে গিয়ে সেখান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে নিহত হয়েছেন। তারা পাকিস্তান গিয়ে সেখানকার উগ্রবাদী সংগঠন তেহরেকি তালিবান পাকিস্তানে যোগ দিতে পারলে, দেশেও কিছু করার চেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ হাজার ৬১১ জঙ্গির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই জঙ্গিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, ২০২১-২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের জুলাই পর্যন্ত জামিন পেয়েছে আরো ৩৮০ জন। এই ৩৮০ জনের মধ্যে ৭ জন আনসার আল ইসলাম, চারজন এবিটি, ৬৮ জন জেএমবি, ছয়জন নব্য-জেএমবি, ছয়জন হিযবুত তাহরীর, চারজন ইমাম মাহমুদের কাফেলা, চারজন হুজি, ১৫ জন জেএএফএইচএস ও ২৬৫ জন নাম-উল্লেখ না থাকা সংগঠনের সদস্য। এর মধ্যে ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আর কখনো আদালতে হাজিরা দেননি। আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। দেশের ১৬টি কারাগারে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারাধীন আছেন ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের মধ্যে ৭৯ জনকে এখনো ধরা যায়নি। এদের মধ্যে ৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।

গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি কার্যকর ই¤েপ্রাভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার হয়। পরে পুলিশ তা নিষ্ক্রিয় করে। ওই দিন সনাতন হিন্দুদের উল্টো রথযাত্রা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার জন্য সেখানে ওই বোমা রাখা হয়ে থাকতে পারে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে বোমা ডিসপোজাল ইউনিট জানায় বোমাটি শক্তিশালী ছিল। এদিকে, গত ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকানে ফেলে যাওয়া ব্যাগের ভেতর থেকেও প্রেসারকুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। পরে শুক্রবার ভোরে বোমা ডেসপোজাল ইউনিট বালুর বস্তা দিয়ে ঘিরে নিরাপদ স্থানে বোমাটির নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমা ডিসপোজাল ইউনিট জানায় বোমাটি শক্তিশালী ছিল। নিষ্ক্রিয় করার সময় দেয়াল ধসের ঘটনা ঘটে।

সাবেক পুলিশের মহাপরির্দশক (আইজিপি) নুরুল হুদা ভোরের কাগজকে বলেন, বিস্ফোরক ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাগুলো আবারো মনে করিয়ে দিয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক অভিযান যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত। কারণ শুধু বোমা নিষ্ক্রিয় করাই নয়, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও ধারাবাহিকভাবে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা জনমনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ এলাকা, গণপরিবহন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটলে মানুষের নিরাপত্তাবোধে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তার মতে, কেবল সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; এর উৎস, সরবরাহ চক্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

গত শনিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়ার খবরে ওই এলাকায় মেট্রোস্টেশনের যাত্রী ও আশপাশ এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছিড়িয়ে পড়ে। তখন দুই মেট্রোস্টেশন কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। খবর পেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়েছে, দুটি বস্তুতেই কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক উপাদান পাওয়া যায়নি। ডিএমপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, দুই মেট্রোস্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু থাকার খবরে জনমনে সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তবে বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক কোনো বস্তু মেলেনি। মিরপুরের ঘটনার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সন্দেহজনক ব্যাগটি এক্স-রে পরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করলে এর ভেতরে কৌটাসদৃশ একটি ইমেজ দেখা যায়। পরবর্তীতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণ করে ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টর ব্যবহার করে নিরাপদে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। পরে ব্যাগটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, এর ভেতরে জর্দার একটি কৌটা ও পান ছিল। ফার্মগেটের ঘটনার বিষয়ে ডিএমপি বলছে, পরিত্যক্ত বস্তা ঘিরে সন্দেহ সৃষ্টি হলে বোমা ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেয়া হয়। ইউনিটের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হ্যান্ড এন্ট্রির মাধ্যমে বস্তাটি পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, বস্তার ভেতরে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক বস্তু নেই।

তবে এসব ঘটনা মেট্রো যাত্রীদের মনে উদ্বেগ ও ভয়ের সৃষ্টি করে। উত্তরা থেকে মিরপুর-১০ এ আসা মেট্রেরেলের যাত্রী আতিকুর রহমান বলেন, যখন তিনি শুনলেন এখানে বোমা পাওয়া গেছে, তিনি ভয় পেয়ে যান। শুধু তিনি নন, তারমতো অনেকে আতঙ্কিত হয়। কারণ তিনি পত্রিকায় পড়েছিলেন মতিঝিলে মেট্রোস্টেশনে একটি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল এক সপ্তাহ আগেই। তা বিস্ফোরিত হলে অনেক ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারত। মিরপুর এলাকার বাসিন্দা ইফতেখার আলম অতীতের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, আমরা জঙ্গি হামলা দেখেছি। শুনেছি অনেক জঙ্গি জামিনে ছাড়া পেয়েছে। এছাড়া এখন আগস্ট মাস। এই মাসজুড়েই একটা শঙ্কা কাজ করে।

চার দশক ধরে অপরাধ নিয়ে কাজ করা সিনিয়র সাংবাদিক পারভেজ খান মনে করেন, গতকালের ঘটনাগুলোতে বোমা না পাওয়া গেলেও আতঙ্ক তৈরি করেছে। আর দুটি ঘটনাই আমরা দেশের অন্যতম যোগাযোগের মাধ্যম ও মূল্যবান সম্পদ মেট্রোরেলকেন্দ্রিক। এগুলো দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনা উচিত। এমনটা না হলে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, জনসমাগমপূর্ণ স্থানে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো ও সন্দেহজনক বস্তু দেখলে কী করতে হবে- সে বিষয়ে জনগণকে আরো সচেতন করা প্রয়োজন।

গতকাল ডিএমপি কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন এক সংবাদ সম্মেলনে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি আতঙ্ক নেই ও কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরো জোরদার করা হয়েছে। যারা নাশকতার পরিকল্পনা করছে কিংবা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও কোনো সন্দেহজনক বা পরিত্যক্ত বস্তু দেখতে পেলে তা স্পর্শ না করে দ্রুত নিকটস্থ থানা পুলিশ অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাজধানীতে অপরাধ বিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ৪৩১

রাজধানীতে অপরাধ বিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ৪৩১

ব্যবসায়িক বার্তা আলাদা রাখতে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার

ব্যবসায়িক বার্তা আলাদা রাখতে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার

৮৫ রানেই ইতিহাস গড়ে শিরোপা জিতল গায়ানা

৮৫ রানেই ইতিহাস গড়ে শিরোপা জিতল গায়ানা

সকালে ঘুমের ভাব? জানুন ক্লান্তি কাটানোর সহজ উপায়

সকালে ঘুমের ভাব? জানুন ক্লান্তি কাটানোর সহজ উপায়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App