চাল নিয়ে সিন্ডিকেটের চালবাজি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। সরকারি ও বেসরকারি গুদামে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকারের গুদামে চালের এই মজুতের পরিমাণ ১৯ লাখ টনেরও বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া ধান ও গম মজুত আছে সোয়া ৫ লাখ টনেরও বেশি। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য ঘাটতির দূরতম কোনো আশঙ্কাও নেই। অথচ দেশের চালের বাজারে আগুন। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হুহু করে বেড়েছে সব ধরনের চালের দাম। এরমধ্যে সুগন্ধি চালের দামে রেকর্ড গড়েছে। ১২০ থেকে দেড়শ টাকা কেজির চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। মিলার, ব্যাপারী-আড়তদার ও করপোরেট ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চালের বাজারে পুরনো চালবাজি খেলা খেলছে। আর এ কারণে চালের বাজারে অস্থিরতা চলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির এক গবেষণা প্রতিবেদনেও চালের বাজার অস্বাভাবিক করার জন্য শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়েছে। নতুন সরকার এসেও এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। বাজারে সরকারের মনিটরিং সেল বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ছে না। ফলে প্রতারিত হয়েই যাচ্ছে ভোক্তা সাধারণ; তাদের পকেট ডাকাতি করে লাভবান হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। আর নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সংসার চালাতে গলদ্ঘর্ম হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহের কৃত্রিম ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত হাতবদলের কারণে চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। উৎপাদক বা কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে এসে পণ্যভেদে দামের ফারাক হচ্ছে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্ত থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে উৎপাদক বা কৃষক।
প্রতিটি বড় মিল ও করপোরেট গুদামে ধানের মজুতের পরিমাণ কঠোরভাবে তদারকি করা, চালের মিল গেট মূল্য, পাইকারি মূল্য ও খুচরা মূল্যের একটি যৌক্তিক ব্যবধান নির্ধারণ করে দেয়া এবং অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে লাইসেন্স বাতিল ও জেল-জরিমানা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগে মিনিকেট, নাজিরশাইল, আটাশ ও পাইজামসহ সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়ে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে পোলাও চালের দামে ডাবল সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত ৬ মাসে পোলাও চালের কেজিতে বেড়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। গত এক সপ্তাহে বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। বাজারে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল কেজিপ্রতি ২১০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা চালের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা।
অনুসন্ধানে চালের বাজার অস্থির করার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ এবং সুনির্দিষ্ট চক্রের হাত
থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তা হলো- করপোরেট জায়ান্টদের আগ্রাসন, অটো মিলারদের কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি। গত কয়েক বছরে চালের বাজারে বড় বড় করপোরেট গ্রুপ প্রবেশ করেছে। তারা মরসুমের শুরুতে সরাসরি মাঠ পর্যায় থেকে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করছে। এদের পকেটে চলে যাচ্ছে বাজারের বড় নিয়ন্ত্রণ। চাল প্যাকেটজাত করে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারের মন্ত্রী ও বড় কর্মকর্তারা এই করপোরেট ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা কুষ্টিয়া, নওগাঁ, দিনাজপুর ও শেরপুরসহ কয়েকটি এলাকার বড় বড় অটো রাইস মিল মালিক। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে চালের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
পাশাপাশি অনেক ব্যবসায়ী লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্সের শর্ত অমান্য করে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ধান ও চাল গুদামজাত করে রাখছেন। নিজেরা দাম বাড়িয়ে কিংবা কারসাজির পরে দাম বাড়লে তারা এই চাল বাজারে ছাড়েন। এছাড়া আছে চাল নিয়ে মিল গেট ও আড়তের চোর-পুলিশ খেলা। মিল মালিকরা দোষ দিচ্ছেন ধানের বাড়তি দামকে। অন্যদিকে পাইকারি আড়তদাররা বলছেন, মিল গেট থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে বলে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু আদতে দুই পক্ষই অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। খুচরা চাল বিক্রেতারা জানান, মিল পর্যায় থেকে প্রতিদিন চালের দাম নতুন করে নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। বেশি দামে কেনার কারণে তারা কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না।
দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। গত ৩০ জুলাই প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। অর্থাৎ কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে। চাল উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ৫টি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষকে আয়ের বড় একটি অংশ খাবার কিনতেই ব্যয় করতে হচ্ছে। তারা আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এর পেছনে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটকে দায়ী করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া প্রভাব বিদ্যমান। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে বড় আমদানিকারকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। চালের সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদকের পর রয়েছে ব্যাপারী, অটো রাইস মিলার, নগর আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা। এ ক্ষেত্রে মূল্য অস্বাভাবিকতা বা শতাংশভিত্তিক ব্যবধান সবচেয়ে বেশি মিলারদের পর্যায়ে দেখা গেছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। কারণ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ঋণ, সার ও বীজে সরকারের দেয়া সুবিধা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না কৃষক।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বাড়ে। দেশে ২০ লাখ টনের মতো সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। রপ্তানি হয় মাত্র ১ শতাংশ। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চালের কেজি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা হয়ে গেছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, দুর্যোগজনিত উৎপাদন ক্ষতি, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও প্রতিযোগিতার মতো নানা বিষয় কাজ করে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, ব্যাপারীসহ বিভিন্ন স্তরের অংশগ্রহণকারীর কারণে প্রতিটি ধাপে মূল্য পরিবর্তিত হয়।
