×

প্রথম পাতা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, ‘বিশ্বযুদ্ধের’ শঙ্কা

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, ‘বিশ্বযুদ্ধের’ শঙ্কা

ফাইল ছবি

ইরানকে ঘিরে চলমান সংকট পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে বহুমুখী সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে সৌদি আরব, ইরাক, ইয়েমেন এবং জর্ডানের মতো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্ররা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এর থেকেও ভয়ংকর সত্য হলো এই সংঘাতে ইরান, চীন ও রাশিয়া একই অক্ষের অংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তারাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত হানবে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

এমন পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ অবসানে গতকাল সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘আমি হত্যার পক্ষে নই, এজন্যই ইরানের সঙ্গে চুক্তি চাই।’ তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘সোমবার তো নয়ই- বরং নিকট ভবিষ্যতেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ফের আলোচনা শুরু করার কোনো পরিকল্পনা তেহরানের নেই।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে কৌশলে বহুগুণ এগিয়ে রয়েছে ইরান। তাই প্রচলিত আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক নীতির বাইরে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে আগাম পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে দেশটি। এর পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি ও তেলবাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জটিল হিসাব। সেক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে ওয়াশিংটন।

সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, সেনা বিশ্লেষকদের কাছে সৃজনশীল ও অপ্রচলিত উপায়ে ইরানকে চাপে ফেলার নতুন পরিকল্পনা চেয়েছে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ই-মেইলে সামরিক বিশ্লেষকদের উদ্দেশে লেখেন, ‘ইরানকে চাপ দেয়া ও শাস্তি দেয়ার নতুন, সৃজনশীল এবং অপ্রচলিত উপায় খুঁজছি।’

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এমন ই-মেইল পাঠানো সামরিক বাহিনীতে অস্বাভাবিক। ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে থাকা সীমিত ও জটিল বিকল্পগুলোরই প্রতিফলন এটি। নতুন কোনো কার্যকর কৌশল খুঁজতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেন্টকম এখন সব ধরনের বিকল্প বিবেচনা করছে এবং বর্তমান কৌশল নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

মূলত গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করতে এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে ইরান এমন এক চাল চেলেছে, যার ফলে কার্যত হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতে। এতে চাপে পড়েছে সৌদি আরবও।

কিন্তু বরাবরই এই যুদ্ধে প্রকাশ্যে জড়াতে চায়নি সৌদি

আরব। সৌদির অনুরোধে কয়েকবার ইরানে বড় ধরনের হামলা চালানো থেকে বিরত থেকেছেন ট্রাম্প। সেই সৌদিই এখন এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইরান- এই তিন শত্রæর মুখোমুখি হয়েছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দেশটি। ইতোমধ্যে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে। একমাত্র সচল থাকা সুয়েজ খালেও ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় অস্থিরতা বেড়েছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নৌপথ সুরক্ষায় বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ নিয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। তবে তা কতোটা কাজে আসবে তা সময়ই বলে দেবে।

এদিকে অপরিশোধিত তেল আমদানি নিয়ে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। এসব দেশ তাদের আমদানির ৯০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রয় করে থাকে। চাপে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলোও। এই চাপ সৃষ্টিতেই মূলত সফল ইরান।

এমন পরিস্থিতিতে রবিবার সরকারি বিমান এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা দেখব পরিস্থিতি কেমন হয়। যে কোনো সময়ে আলোচনা শুরুর জন্য আমরা প্রস্তুত। আমি কি (ইরানের সঙ্গে) একটি চুক্তি চাই? হ্যাঁ, আমি অবশ্যই চুক্তির পক্ষে; কারণ আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। যদি চুক্তি না হয়- তাহলে বহু মানুষ মারা যাবে এবং আমরা তা চাই না।’

এদিন ট্রাম্প বলেন, ‘আজ ৩ আগস্ট সোমবার (গতকাল) থেকে মার্কিন ও ইরানের সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে ফের আলোচনা শুরু হচ্ছে।’ তার আগে শনিবার থেকে ইরানে বিমান অভিযান স্থগিত করেছেন তিনি। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সময় অবশ্য তিনি বলেছেন, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা করেই অভিযান স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্প বলেছেন, ‘এবারের আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মুক্ত চলাচলও সমান গুরুত্ব পাবে।’ তবে কোথায় এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বা এতে কারা অংশ নেবেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

যদিও ট্রাম্পের এই আলোচনা শুরু করার দাবি নাকচ করে দিয়েছে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা শুরু হচ্ছে না এবং নিকট ভবিষ্যতে কোনো আলোচনা বা বৈঠকের শিডিউল নেই। আসন্ন দিনগুলোতে কোনো বিদেশি আলোচক প্রতিনিধি দলকে আতিথেয়তা দেয়া কিংবা কোনো ইরানি প্রতিনিধি দলকে বিদেশি পাঠানোর পরিকল্পনাও আমাদের নেই।’

ইসমাইল বাঘাই জানান, ইরানের আলোচক দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি ছাড়া বাকি সদস্য বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক ধর্মীয় তীর্থযাত্রার উদ্দেশে বর্তমানে ইরাকে অবস্থান করছেন সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। চলতি সপ্তাহে তার ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বৈঠক হওয়া সম্ভব নয়’, রয়টার্সকে বলেছেন ওই কর্মকর্তা।

এমন আবহে নিউইয়র্কে সাংবাদিক ম্যানাস ক্র্যানিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিআইএ পরিচালক মাইক পম্পেও বলেছেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের চেয়েও বড়। এটি একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ সংঘাতের অবসানের রূপরেখা হিসেবে তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেন- অবিরাম অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সামরিক চাপ। তিনি বলেন, ‘এই তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে চলতে হবে।’

মাইক পম্পেও বলেন, ‘ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক চাপ দেশটির অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রাকে এরই মধ্যে দৃশ্যমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যদিও সেই প্রভাব পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে না বিশ্ব। আজ ইরানের দোকানের তাক আগের মতো পূর্ণ নয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।’

মাইক পম্পেও দাবি করেন, ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। যদিও বেইজিং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে পম্পেওর মতে, তারা অস্বীকার করছে বলেই বিষয়টি আরো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে।

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যারা ইরানের তেল কিনছে, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’ দ্য ন্যাশনাল-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে পম্পেও জানান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মৌলিক কোনো মতপার্থক্য নেই।

সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু এড়িয়ে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা উচিত। ইরান ইসরায়েলের পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে কারণ তেহরান মনে করে এসব দেশ শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে না।’ তবে পম্পেওর বিশ্বাস, উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সময় যত এগোচ্ছে, এই যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়ছে। নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। যা বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইরান যুদ্ধ কি ডেকে আনছে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সংঘাত?

নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইরান যুদ্ধ কি ডেকে আনছে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সংঘাত?

আলজাজিরার সম্প্রচার ‘নিষিদ্ধ’ করল পাকিস্তান

আলজাজিরার সম্প্রচার ‘নিষিদ্ধ’ করল পাকিস্তান

জবিতে ছাত্রদল–জকসু–ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ

জবিতে ছাত্রদল–জকসু–ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সরকার

তথ্য উপদেষ্টা শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সরকার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App