হামলা হলে এক সঙ্গে লড়াই করবে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যেই একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় গতকাল শুক্রবার এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এই চুক্তি এমন এক সময়ে হলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাত চলছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবারও সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল নাজরান প্রদেশে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা এই হামলা চালিয়েছে। হামলায় আহত ১১ জন বেসামরিক মানুষের মধ্যে সাত সৌদি নাগরিক, এক ইয়েমেনি, দুই মিসরীয় ও এক পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া আহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে।
এই হামলার ঘটনা গতকাল শুক্রবার ভোরে নিশ্চিত করেছেন সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে নাজরান প্রদেশে বেসামরিক এলাকায় নির্বিচার গোলাবর্ষণ করেছে হুতিরা। বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তবে এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হুতি কিংবা ইরানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এমন পরিস্থিতির পর পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সৌদি আরবের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী- ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) তত্ত্বাবধানে থাকা হুতি ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শিগগিরই সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালাতে পারে। তাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব।’
তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য হামলার এ তথ্য উদ্বেগজনক। কারণ সৌদি আরব এখনো ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজছে।’ তার দাবি, এ বিষয়ে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে। চলমান এ কূটনৈতিক
প্রচেষ্টা ভন্ডুল করা পরিকল্পিত হামলার উদ্দেশ্য হতে পারে।’
ওই সৌদি কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সব পর্যায়ে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় আছে। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সরাসরি কাজ করছে।’ যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে সৌদি আরব প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালানোর পর থেকেই উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে ইরান ও তার মিত্ররা। একই সঙ্গে এসব দেশের জ্বালানি রপ্তানির পথও অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে তেহরান।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়াতে না চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়ার কারণে বারবার রিয়াদকে হোঁচট খেতে হচ্ছে। প্রায় এক দশক ধরে চলা সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের দ্ব›দ্ব এখন ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আরো তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে হুতিদের অবরোধের কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার সৌদি আরবের নাজরান বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা। সাম্প্রতিক সময়ে তারা সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের মারিব ও হাদরামাউত প্রদেশে সৌদি-সমর্থিত সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়ে ৩০ জনের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে হুতিরা।
এর আগে ২৯ জুলাই সৌদি আরব জানিয়েছিল, তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলার জন্য ইরাকের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালানো হয়েছে। এরপর ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাল্টা জবাব দেয়ার হুমকি দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোরদার করার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার ওই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চুক্তিতে সইকারী তিন দেশই সুন্নি-প্রধান এবং তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা।
চুক্তি সইয়ের পর যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ বলেছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধের সক্ষমতা জোরদার করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। এর আওতায় প্রতিটি দেশ কী ধরনের প্রতিশ্রæতি দিয়েছে বা দায়িত্ব নিয়েছে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এতে বলা হয়েছে, সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অঞ্চল ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার একটি ধারা রয়েছে। এটি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক। এতে শুধু আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের এতে যোগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এটি বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি বাতিল বা প্রতিস্থাপন করে না।
চুক্তিতে সইকারী তিন দেশের আরেকটি সাধারণ অবস্থান হলো- তারা ইসরায়েল ও বিপ্লবী শিয়া রাষ্ট্র ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসি সামরিক অবস্থান নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। এমন এক সময়ে এই চুক্তি করা হলো, যখন তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর সমালোচনা করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম রেজাই। তার দাবি, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই চুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা এ ধরনের ‘কাগুজে চুক্তি’ সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বছরের পর বছর একপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখেও সৌদি যে নিরাপত্তা পায়নি, নতুন এই চুক্তিও তাদের সেই নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
সৌদি আরবকে নিজেদের নীতিতে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়ে রেজাই বলেন, এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত, যাতে অন্য দেশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে না হয়।
এর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায়ও যেকোনো এক দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক এবং কৌশলগত লড়াই একটি প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করে, যা সৌদি আরবকে প্রায়শই কঠিন কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। ইরানের সহায়তায় সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এবং তেলক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইয়েমেনের হুথিরা। বর্তমানে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সৌদি আরব টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। এ জল বহুদূর গড়াবে বলে শঙ্কা ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের।
