ব্রিকস সম্মেলন
কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ভারত
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকসের অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। তবে স্বার্থের সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সফলতা একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
বর্তমানে ১১টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক জোট হলো ব্রিকস। এর সদস্য দেশগুলো হলো- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া।
ব্রিকসের মূল উদ্দেশ্য হলো- বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে উন্নত দেশগুলোর প্রভাব ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং গেøাবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। ২০০৯ সালে ১৬ জুন রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গ শহরে প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ব্রিক’ (ইজওঈ) গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ ছিল- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। তখন এর নাম হয় ‘ব্রিকস’ (ইজওঈঝ)।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিকসের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেখানেই। এই জোট যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই বেড়েছে এর সম্ভাবনা। একই সঙ্গে বেড়েছে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করার জটিলতাও।
ব্রিকস বর্তমানে এমন একটি মঞ্চ, যেখানে একই সংগঠনের সদস্য চীন ও ভারত। এশিয়ায় প্রভাব ও শক্তির ভারসাম্য নিয়ে এই দেশ দুটির মধ্যে প্রতিদ্ব›িদ্বতা তীব্র। এছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রেখেছে ভারত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর হয়েছে দিল্লির। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্ব›িদ্বতা ও স্বার্থের সংঘাত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ- সব মিলিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা।
আরও পড়ুন: রাশিয়ার নৌঘাঁটি-চার যুদ্ধজাহাজে হামলা ইউক্রেনের
একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির পুরোনো জোট ও নির্ভরতার কাঠামোও। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ যেমন বাড়ছে, তেমনি নিজেদের প্রভাবের পরিসর বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে চীন, ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি।
এমন অবস্থায় ভারত একদিকে ব্রিকসের নেতৃত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্কও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ভারত নিজেকে কোনো একটি শক্তিশিবিরে পুরোপুরি আবদ্ধ না রেখে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার নীতি অনুসরণ করছে। ব্রিকস ভারতের সেই বৃহত্তর কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ব্রিকসকে এমন কোনো সংগঠন হিসেবে দেখতে চাইবে না, যা তাকে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়; বরং দিল্লি চাইবে,
ব্রিকসের মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণে নিজের প্রভাব ও নেতৃত্বের দাবি জোরালো করতে, চীনের সঙ্গে একই মঞ্চে থেকে নিজের স্বার্থ ও প্রভাবের জায়গা শক্তিশালী করতে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে। এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা ভারতের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। আর ব্রিকসের সভাপতিত্ব সেই ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি।
এমন পরিস্থিতিতে গত ১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠকের বিষয় সামনে এসেছে। ওই সময় পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সদস্যদেশগুলো একটি অভিন্ন যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ভারতকে সভাপতির দায়িত্ব থেকে পৃথক ‘সভাপতির বিবৃতি’ ও ফলাফল নথি প্রকাশ করতে হয়। ওই নথিতেও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করা হয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ না হওয়ার বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাটিই প্রকাশ্যে এসেছে। একই সংগঠনে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। বৈঠকেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে সাফল্য পেতে হলে ভারতকে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সেগুলো হলো- চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম কার্যকর সমঝোতার পথ তৈরির পরিবেশ করতে হবে ভারতকে। ব্রিকসের মাধ্যমে এমন একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা সদস্যদেশগুলোর জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে। বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে ব্রিকসে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দিতে হবে। এছাড়া সম্প্রসারিত ব্রিকসকে এমন একটি কার্যকর কাঠামো দেয়া, যেখানে সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে না। মূলত এর কোনোটিই সহজ নয়। তাই এই সম্মেলনকে ঘিরে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ভারত।
