×

প্রথম পাতা

নিত্যপণ্য

বাজারের উত্তাপে বদলে গেছে কেনাকাটার ধরন

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজারের উত্তাপে বদলে গেছে কেনাকাটার ধরন

ফাইল ছবি

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গলির সামনের রাস্তায় ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রি করতে দেখা যায় অনেক বিক্রেতাকে। প্রতিদিনের মতো, গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে গোপীবাগ এলাকার বিসমিল্লাহ মসজিদের গলিতে সবজি বিক্রি করছিলেন কাদের মিয়া। ভ্যানে সাজানো লাউ, বেগুন, পটল, পেঁপে, কাঁচা মরিচ, ঢেঁড়শ, শসা আর কয়েক ধরনের শাক। অন্য দিনের মতো ক্রেতারা আসছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, তারপর অনেকেই কিছুক্ষণ চুপ থেকে চলে যাচ্ছেন। কাদের মিয়ার কাছে এমন ঘটনা নতুন নয়। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, সবাই তো আর কিনবে না। যাদের দাম শুনে পছন্দ হতো না তারা দাম জিজ্ঞেস করে চলে যায়। আমার কিছু বান্ধা (নির্ধারিত) কাস্টমার আছে। তারা সবসময় আমার কাছ থেকেই সবজি কিনেন। তবে গত কয়েক মাসে যে চিত্রটি কাদের মিয়ার চোখে পড়েছে তা হলো- আগে যারা কয়েক ধরনের সবজি কিনতেন এবং এক কেজির কমে সবজি কিনতেন না তারা এখন এক/দুই ধরনের সবজি কিনছেন এবং এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) বা আধা কেজি করে কিনছেন। কারণ কী জানতে চাইলে কাদের মিয়া বলেন, দাম বেশি হলে মানুষ কিনব কেমনে? আমরা বেশি দাম দিয়ে কিনে আনি, কম দামে তো বিক্রি করতে পারি না।

গোপীবাগ মাজাররোড এলাকায় কথা হয় গৃহিণী মুনীরা বেগম ও স্মৃতি দাসের সঙ্গে। দুজনেই ?গোপীবাগের বাসিন্দা। ভ্যান থেকে সবজি কিনছিলেন এই দুই গৃহিণী। তারা বলেন, আগে বাজারের তুলনায় ভ্যানে সবজি, ডিম ও অন্য পণ্যের দাম কিছুটা কম থাকত। আমরা প্রায় সময়ই ভ্যান থেকে বাজার করি। ভ্যানের সুবিধাও আছে। কারণ বাজারে যেতে হয় না। তারাই বাসার সামনে আসে। কিন্তু এখন ভ্যানের জিনিসের দামও চড়া। স্বল্প আয়ের মানুষের না খেয়ে মরার অবস্থা এখন।

আরও পড়ুন: ৮০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো সবজি

মুনীরা বেগম বলেন, আমার বাসায় ডিম লাগে প্রচুর। ছোট বাচ্চা আছে, বয়স্ক মানুষ আছে। আগে ভালো ডিম আর কিছুটা খোসা ভাঙা ডিমের ডজনের দামে পার্থক্য থাকত ২০ থেকে ৩০ টাকা। এখন সেই ব্যবধানও কমে গেছে। এখন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় ডিম বিক্রি হলে ভাঙা ডিম বিক্রি হয় ১৩০ টাকা। আগে শুনতাম তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ নাকি স্বল্প আয়ের মানুষের মাছ। এখন তো দেখছি সবাই ঝুঁকছে এই মাছের দিকে। ফলে ওই মাছের দামও ধীরে ধীরে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

কয়েক মাস আগেও ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে বাসায় ফিরতেন সিফায়েতুল্লাহ। পেশায় আইনজীবী সিফায়েতুল্লাহর বয়স ষাটের কোটায়। গতকাল শুক্রবার দুপুরে শান্তিনগর কাঁচা বাজারে তার সঙ্গে কথা হয়। চোখে-মুখে যেন রাজ্যের বিরক্তি আর ক্ষোভ। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও কয়েক ধরনের সবজি কিনতে পারতাম। ডিমের দামটাও আয়ত্তের মধ্যে ছিল। কিন্তু দিন দিন পরিস্থিতি খারাপই হচ্ছে। এখন ব্যাগ ভর্তি বাজারতো দূরের কথা নিকট অতীতের ঘটনাও রূপকথার মতো মনে হয়।

আরেক ক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, সাধারণ মানুষের কথা কেউই ভাবে না। নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের নানা প্রতিশ্রæতি দেয়া হলেও বাস্তবে বাজারের চিত্র খুব একটা বদলায় না। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কম দামে নিত্যপণ্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয় কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রæতির বাস্তবায়ন করার কথা ভুলে যান।

ক্রেতা বিক্রেতাদের এমন বক্তব্যেই যেন ধরা পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারের সংকটের চিত্র। দাম বাড়ছে শুধু বড় বাজারের দোকানে নয়; পাড়া-মহল্লার ভ্যানের পণ্যেও সেই চাপ পৌঁছে গেছে। আর সেই চাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাজার করার ধরনও বদলে যাচ্ছে। আগে সপ্তাহের জন্য একসঙ্গে বেশি পরিমাণে সবজি, মাছ, মাংস বা অন্যান্য পণ্য কিনতেন যেসব পরিবার, তাদের অনেকেই এখন প্রতিদিনের প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে কিনছেন। কারোর বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে মাছ। কারো মাংসের পরিমাণ কমছে। কেউ একসঙ্গে ৫ ধরনের সবজি না কিনে এক বা দুই ধরনের সবজি দিয়ে সপ্তাহ চালানোর চেষ্টা করছেন।

শুধু দাম নয়, পুষ্টিও ঝুঁকিতে

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে মানুষ প্রথমে কম দামি বিকল্পের দিকে ঝোঁকে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রবণতা চললে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। মাছ-মাংসের দাম বেশি হলে অনেক পরিবার কম পরিমাণে সেগুলো কিনতে পারে। ফল, দুধ বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। অর্থাৎ বাজারদর বাড়ার প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং নি¤œ ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

?রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, সবজি, মাছ ও মাংসসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোনো একটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অন্য কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই অবস্থা যেন স্বল্প ও নি¤œ আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস তুলেছে। মাছ ও মাংসের দাম মোটামুটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে। তবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম কমেছে ১০ টাকা। একই সঙ্গে কাঁচা মরিচের দামও কিছুটা কমেছে।

আরও পড়ুন: গ্যাস-বিদ্যুতে নাকানিচুবানি

ডজনপ্রতি ডিমের দাম কমেছে ১০ টাকা

সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে ডজনপ্রতি ডিমের দাম কমেছে ১০ টাকা। বর্তমানে এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। গত সপ্তাহে যা ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। সাদা ডিম মিলছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। আর খোসা ফাঁটা ডিমের ডজন ১১০ থেকে ১২০ টাকা। হাঁসের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা ডজন।

ঝাল কমেছে কাঁচা মরিচের; অধিকাংশ সবজির দাম ৮০ টাকার বেশি

বাজারে কাঁচা মরিচের ঝাল যেন কিছুটা কমেছে। প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা দরে, যা আগের সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকায়। বাজারে বেশির ভাগ সবজির দামই ৮০ টাকার বেশি। প্রতিকেজি বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকায়, গাজর ১২০, ঢ্যাঁড়স ৫০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০, ঝিঙা ৮০ টাকা, টমেটো ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, গাজর ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, কাঁচাকলার হালি ৪০ টাকা, বরবটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পটল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, শসা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ধুন্দুল ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস কচু ৮০ থেকে ১০০ টাকা, লাউ ৮০ থেকে ১০০, চাল কুমড়া ৫০ থেকে ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া এক ফালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, আলু ৩০, দেশি আদা ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং ভারতীয় রসুন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

?সবজি বিক্রেতারা বলছেন, কাঁচা মরিচের সরবরাহ আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। এ কারণে দামও কমেছে। অন্যদিকে অন্যান্য সবজির সরবরাহ ও চাহিদা স্বাভাবিক থাকায় সেগুলোর দামে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

মুরগির দামও কমেছে কিছুটা

মুরগির বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমেছে। আগে প্রতি কেজি ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৯০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে সোনালি, হাইব্রিড ও লেয়ার মুরগির দামে কোনো পরিবর্তন নেই। সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ এবং লেয়ার মুরগি ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে গরুর মাংসের বাজারেও বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা দরে আর খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজারে দেখা গেছে ওঠানামার প্রবণতা

চাষের পাঙাশ প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে চিংড়ি ৮০০ থেকে ১২০০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৮০০, রুই ৩০০ থেকে ৫৫০ এবং ট্যাংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩৫০, বাইন ৫০০ থেকে ৮০০, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০, চাষের কই ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, পোয়া ২৬০, শোল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, আকারভেদে চাষের শিং ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর রূপচাঁদা, বড় শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে এক হাজার টাকার বেশি।

মাছ বিক্রেতারা বলছেন, মাছের দাম আগের মতোই আছে। কিছু মাছের দাম সবসময় বেশি থাকে। ২০ থেকে ৩০ টাকা ওঠানামা করে। সকালে মাছের এক দাম, আবার বিকালে আরেক দাম থাকে।

চালের দামও অপরিবর্তিত রয়েছে

প্রতিকেজি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বিআর-২৮ ৬০ টাকা, মিনিকেট ৭৮ টাকা ও কাটারি নাজির ৮৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘ওর দেহরক্ষী হয়ে গিয়েছিলাম, খুব চিন্তা হত’

‘ওর দেহরক্ষী হয়ে গিয়েছিলাম, খুব চিন্তা হত’

বি. চৌধুরীর সঙ্গে কেন বনিবনা হয়নি, জানালেন অলি

বি. চৌধুরীর সঙ্গে কেন বনিবনা হয়নি, জানালেন অলি

আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের কার্যতালিকায়

রামিসা হত্যা মামলা আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের কার্যতালিকায়

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব চূড়ান্ত, শিগগিরই মন্ত্রিসভায়

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব চূড়ান্ত, শিগগিরই মন্ত্রিসভায়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App