×

প্রথম পাতা

ট্রাম্পের ‘অথনৈতিক যুদ্ধ’ কীভাবে সামলাবে ইরান

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের ‘অথনৈতিক যুদ্ধ’ কীভাবে সামলাবে ইরান

ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে ইরানের ওপর নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ বা ক্রাশিং ইকোনমিক অপারেশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনকারী যেকোনো তৃতীয় পক্ষ বা দেশকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পকে উপহাস করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ অভিযান ওয়াশিংটনের জন্য আরো একটি ‘পরাজয়’ বয়ে আনবে।

যদিও শঙ্কা প্রকাশ করে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর ঘোষিত নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা তেহরানের অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিতে পারে। এর ফলে ইরানি মুদ্রার চরম দরপতন, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ধস নামবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তীব্র সংকটের মুখে পড়বে। পাশাপাশি, এই পদক্ষেপে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।

তারা আরো বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানে খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নামতে পারে। এতে ইরানি জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া তেল চোরাচালান, মানি এক্সচেঞ্জ এবং নগদ অর্থ স্থানান্তর বন্ধ হওয়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার উৎস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে- কীভাবে এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করবে ইরান? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তেহরানের ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থা বা তাদের নীতি পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, আশির দশক থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে ইরান নিজস্ব বিকল্প অর্থনীতি ও ‘ছায়ানৌবহর’ তৈরি করে টিকে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক (যেমন সুইফট) থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে তেল বিক্রি ও অর্থ লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এছাড়া বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে সরাসরি পণ্যের বিনিময়ে পণ্য (বার্টার) আমদানির পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।

এছাড়া চীনের স্বাধীন বা ছোট তেল শোধনাগারগুলোর কাছে কম মূল্যে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখা ইরানের মূল অর্থনৈতিক লাইফলাইন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বাণিজ্য স্থগিত করলেও ইরাক, তুরস্ক বা অন্যান্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থলপথের বাণিজ্যের মাধ্যমে খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের বিকল্প খোলা রাখার চেষ্টা করছে ইরান।

মূলত গত বুধবার ইরানের অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে নতুন করে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আজ আমি কোনো দেশের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত নেয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করছি! এটি হবে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও একঘরে অবস্থা।’

ট্রাম্প হুমকি দিয়ে আরো বলেন, ‘যে দেশ তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেয়ার সুযোগ দেবে, সেই দেশকেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।’

ইরানকে সহায়তা করলে দেশগুলোকে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি ট্রাম্প। ইরান ছাড়া অন্য কোনো দেশের নামও উল্লেখ করেননি তিনি। তবে বেশ কয়েকটি কর্মকাণ্ডের তালিকা দেন ট্রাম্প, যেগুলো তার ভাষায় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

এর আগে গত সপ্তাহে রক্ষণশীল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নিউজম্যাক্সকে একই ধরনের কথা বলেছিলেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি বলেছিলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের পাশাপাশি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শিগগিরই জোরদার করবে যুক্তরাষ্ট্র- এটি হবে দ্বিমুখী কৌশলের অংশ। এটি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার এমন এক সমন্বিত উদ্যোগ হবে, যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি।’

গত কয়েক মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে একটি অভিযান চালিয়ে আসছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়)। এর লক্ষ্য হলো, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ইরানের অর্থায়নের পথ বন্ধ করে দেয়া।

এদিকে ট্রাম্পের এই উদ্যোগের সমালোচনা করে গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লিখেছেন, তথাকথিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের সংকট (অভূতপূর্ব ঋণ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা সুদের ব্যয়) থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল।

আরাগচি আরো লেখেন, ‘আর ব্যর্থ নীতিগুলো জোরদার করা হলে

একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের পরাজয় আরো বড় হবে, তেমনি অপরদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রæতার মাত্রাও বাড়বে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথিত অর্থনৈতিক অভিযান আসলে অর্থনৈতিক সন্ত্রাস এবং এ সন্ত্রাস বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।’

এ বিষয়ে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এক্স-এ বলেন, ‘সামরিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধে নেমেছে। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) দাবি করছে, ইরান পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এবং একটি সুতোয় ঝুলছে; অথচ তারাই তাদের সব মিত্রকে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সমস্যা হলো তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) ভুল হিসাব। প্রতিবার তারা নিজেদের ভুল হিসাব আড়াল করার চেষ্টা করে, তখনই তারা নিজেদের জন্য আরো বড় ব্যর্থতা তৈরি করে। সামরিক যুদ্ধ তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, আর এখন তারা তাদের পরবর্তী ব্যর্থতার নাম দিয়েছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ।’

উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও এ পর্যন্ত সমাধানের কোনো পথ পাওয়া যায়নি। গত ১৭ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ১৪ দফার একটি নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের এই সাময়িক বিরতিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের দীর্ঘ দিনের বিরোধ বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সংঘাতপূর্ণঅঞ্চলে দুই দেশের উপস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি চালুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধান খোঁজা। চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, স্থগিত তহবিল ফেরত দেয়া এবং ইরান উপকূল থেকে মার্কিন সেনা হ্রাসের প্রতিশ্রæতি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও দুই পক্ষের মতপার্থক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত এই মেয়াদের মধ্যে স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পূর্বের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতিতে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নতুন করে চরম অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দিয়েছে। এই কৌশলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে নাকি আবারো হোঁচট খাবেন ট্রাম্প তা সময়ই বলে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির শপথ নেবেন মির্জা ফখরুল

আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির শপথ নেবেন মির্জা ফখরুল

‘আমাকে তো নিয়ে যাবেনই’,  দীপু মনির আকুতি

‘আমাকে তো নিয়ে যাবেনই’, দীপু মনির আকুতি

রাজপথ থেকে রাষ্ট্রপতি, মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ইতিহাস

রাজপথ থেকে রাষ্ট্রপতি, মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ইতিহাস

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দর্শনীয় স্থান বন্ধ

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দর্শনীয় স্থান বন্ধ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App