চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৯৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা পৌরকর আদায়
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় নিয়ে অনেকদিন ধরেই বন্দর ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছিল।
তিনবারের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় নিয়ে অনেকদিন নানা দেনদরবার, আন্দোলন সংগ্রাম করে কিছু রাজস্ব আদায়ও করেছিলেন।
এরপর মাঝখানে সে প্রক্রিয়া নানা কারণে তেমন সচল বা সক্রিয় ছিল না। তবে বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন চসিকের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি এ রাজস্ব আদায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নানা দেনদরবার ও বৈঠকের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এককালীন ১৯৮ কোটি ২৭ লাখ রাজস্ব আদায় করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
তবে ২৬৪ কোটি টাকা মূল্যায়িত পৌরকরের (হোল্ডিং ট্যাক্স) বিপরীতে নিয়মানুযায়ী আপিল করার শর্ত হিসেবে এই বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চসিকের ইতিহাসে আগে কখনো একক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় হয়নি। গতকাল সোমবার বিকালে টাইগারপাস চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এই হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই টাকা চূড়ান্ত পৌরকর হিসেবে নয়, বরং উচ্চতর আপিলের আইনি বাধ্যবাধকতা রক্ষার্থে ‘জামানত’ হিসেবে জমা দেয়া হয়েছে। এদিকে সংবাদ সম্মেলনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বললেন, ‘গত ২০১৬-১৭ ও ১৭-১৮ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ চসিককে মাত্র ৪৫ কোটি টাকা ট্যাক্স দিত। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম এর প্রতিবাদ জানাই।
বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী গাড়িগুলো নগরের ১০ টন ধারণক্ষমতার সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করায় প্রতি বছর আমাদের ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাস্তা সংস্কারে খরচ করতে হয়। অথচ আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ (কমপেনসেশন) চার্জ নিই না; শুধু আমাদের ন্যায্য হোল্ডিং ট্যাক্স চেয়েছি।’
মেয়র জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চসিক ও বন্দরের যৌথ দল ১ কোটি ৯৭ লাখ বর্গফুট জায়গার ওপর যৌথ মূল্যায়ন সম্পন্ন করে। এর ভিত্তিতে ২৬৪ কোটি টাকা ট্যাক্স ধার্য করা হয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ও চসিকের আইন অনুযায়ী এই টাকা পরিশোধের তাগিদ দেয়। পরবর্তীতে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিলে তারা কর কমানোর দাবি না জানিয়ে রিঅ্যাসেসমেন্টের দাবি জানান। আইন অনুযায়ী সেটি সম্ভব নয় বলে জানান মেয়র।
আইন অনুযায়ী, এখন বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করবেন। এই জন্য মোট দাবির ৭৫ শতাংশ টাকা আগে পরিশোধ করতে হয়। সেই বাধ্যবাধকতা থেকেই বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা চসিকের তহবিলে জমা দিয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ টাকা বিভাগীয় কমিশনারের শুনানির পর আদায়ের আশা প্রকাশ করেন মেয়র।
রাজস্বের টাকা কোন কোন খাতে খরচ হবে, তার একটি রোডম্যাপ তুলে ধরেন মেয়র। ডা. শাহাদাত হোসেনের ভাষ্য, ‘আজই আমি পোস্তারপাড় স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি একটি ভবন ধসে পড়ার মতো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। টাকার অভাবে কাজ আটকে ছিল। এই প্রাপ্ত অর্থ থেকে প্রথম কাজ শুরু হবে ধসে পড়া স্কুল ভবন পুনর্নির্মাণে। চসিকের অধীনস্থ ৭৮টি স্কুল ও ২৮টি কলেজের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো উন্নত করা এবং গরিব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ার খরচ যোগাতে এই টাকা বিনিয়োগ হিসেবে ব্যয় করা হবে।’
এদিকে চসিকের এই বিশাল রাজস্ব অর্জনকে ‘পৌরকর আদায়’ হিসেবে মানতে নারাজ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যে ২৬৪ কোটি টাকার ট্যাক্স দাবি করেছিল, আমরা তার পুনর্বিবেচনার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করব।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী আপিল করতে হলে দাবি করা টাকার ৭৫ শতাংশ জামানত হিসেবে জমা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। আমরা আজ সেই নিয়ম মেনেই ১৯৮ কোটি টাকা জামানত হিসেবে জমা দিয়েছি। বিভাগীয় কমিশনার শুনানিতে যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ বা টাকা সমন্বয় করা হবে। তাই এটিকে এখনই ‘পৌরকর জমা দেয়া হয়েছে’ বলার কোনো সুযোগ নেই।
তবে চসিক তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুকে জানিয়েছে- চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা কর আদায় নিশ্চিত করে চসিকের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
দীর্ঘদিনের বকেয়া কর আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ, ধারাবাহিক আলোচনা এবং প্রশাসনিক তৎপরতার মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। চসিকের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বৃহৎ কর আদায়ের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজস্ব বৃদ্ধি, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নগর উন্নয়নে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, এই কর আদায় তারই একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
