রাউজান এখন ক্রাইম জোন
এম. রমজান আলী রাউজান (চট্টগ্রাম) থেকে
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
উত্তর চট্টগ্রামে ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিত। রাউজানে গত ২৩ মাসে ৩২টি খুন ও অন্তত ৫৫টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাউজানসহ বিভিন্ন থানায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। রাজনৈতিক আধিপত্য, পূর্বশত্রæতা, ব্যক্তিগত বিরোধ ও অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই সময়ে থানার ছয়জন ওসি এবং ৪২ জন এসআই ও এএসআই বদলি হয়েছেন।
জেলা পুলিশ অতিরিক্ত ১৬০ সদস্য মোতায়েন করলেও আলোচিত খুনগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী ও ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নেয়া চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের অনেকেই এখনো অধরা।
পুলিশের ভাষ্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং পার্বত্য এলাকার দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে অভিযানে এখন পর্যন্ত হত্যা মামলার ৬৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১১ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন।
পাহাড়ে খুনিদের নিরাপদ আশ্রয় : রাউজানের উত্তর ও পশ্চিমে ফটিকছড়ি, পূর্বে রাঙ্গুনিয়া ও রাঙামাটির কাউখালী এবং দক্ষিণে বোয়ালখালী ও কর্ণফুলী নদী। কদলপুর, হলদিয়া, ডাবুয়া ও রাউজান ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পার্বত্য রাঙামাটির সঙ্গে সংযুক্ত। এসব পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্ন বসতিগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, রাউজানে সংঘটিত আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেক সন্ত্রাসীর পার্বত্য এলাকার অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তারা দ্রুত পাহাড়ে আত্মগোপন করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। সর্বশেষ রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম মাসুদ হত্যার ঘটনায় একজন আসামিকে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড় থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২৩ মাসে ২৩ হত্যা মামলা : গত ২৩ মাসে রাউজান থানায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১১টি, পারিবারিক বিরোধে তিনটি এবং অন্যান্য ঘটনায় নয়টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর বাইরে রাউজানের ঘটনায় হাটহাজারী থানায় তিনটি, কাউখালী থানায় দুটি এবং নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে হত্যা মামলার সংখ্যা ২৯টি। আরও তিনটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত না পাওয়ায় সেগুলো হত্যা মামলা হিসেবে গণ্য হয়নি।
একের পর এক হত্যা : ২০২৪ সালের আগস্টে শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মন্নান হত্যার পর থেকে রাউজানে ধারাবাহিকভাবে হত্যার ঘটনা ঘটছে।
সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে কর্মচারী ইউসুফ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার, আজম খান, ওলামা লীগ নেতা আবদুল মন্নান এবং রূপা আক্তারের মৃত্যু এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালে শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম, যুবলীগ নেতা হাসান, যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন জিতু, প্রকৌশলী নূরুল আলম বকুল, যুবদল নেতা আবদুল্লাহ, ইব্রাহিম, আলমগীর, সেলিম, দিদারুল আলম, বিএনপি নেতা আবদুল হাকিম, যুবদল নেতা আলগীর আলম এবং নৈশপ্রহরী শফিউল আলমসহ একাধিক ব্যক্তি হত্যার শিকার হন। চলতি বছরও থামেনি রক্তপাত। জানে আলম সিকদার, মজিবুর রহমান, কাউছার উজ জামান বাবলু, নাছির উদ্দিন (মধু নাছির), হাসান রাজু, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম মাসুদ, রাশেদ, স্কুল দপ্তরি স্বপন বড়য়া, কিশোর সাব্বির এবং সর্বশেষ হলদিয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী আবদুল মন্নান নিহত হয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য : রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, গত ২৩ মাসে দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোয় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১১ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তারা পাহাড়ি এলাকায় যৌথ অভিযান জোরদার, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
