এককালীন ২ কোটি, প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা না দেয়ায় তাণ্ডব
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য ব্যবসায়ীকে মোবাইলে হুমকি। ব্যবসা না ছাড়লে এককালীন ২ কেটি টাকা এবং প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ‘সমন্বয়’ করে ব্যবসা করতে হবে। শুধু তাই নয় সিএমপি কমিশনারকে ফোনকারী সন্ত্রাসীর ছবি দেখিয়ে তাতে পুলিশ কমিশনার চেনেন কিনা তাও জেনে নেয়ার জন্য শাসিয়েছেন ওই ব্যবসায়ীকে।
এমন হুমকি দেয়ার দুইদিন পরই নগরীর চন্দনপুরা-বাঁকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে হামলা-ভাঙচুর করে নির্বিঘ্নে চলে গেছে। কিন্তু এসব সন্ত্রাসী কাউকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা অব্দি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য কোনো সংস্থা। বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের গ্রুপ এই হামলা-ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে। এই কথোপকথন ও ভাঙচুরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
গত সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাঁকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, সন্ত্রাসী গ্রুপটি দুই কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিল। সেই চাঁদার টাকা না পেয়ে দিন-দুপুরে হামলা চালায়। পুলিশের দাবি, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলায় জড়িত। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সাজ্জাদের অনুগত সন্ত্রাসীরা এ কাজ করে থাকতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে আমার কাছে ফোন আসে। এতে ইমন বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দিবি। মাসে দিবি ১০ লাখ।’ এখন থেকে ব্যবসা আমরা করব। মামুনের অভিযোগ, চাঁদা না দেয়ায় তারা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘মুঠোফোনে কথোপকথনের সময় ডেভিড ইমন নিজেকে সবাই চেনে বলে দাবি করেন। এমনকি তার ছবি পুলিশ কমিশনারকে দেখিয়ে চিনে নিতে বলেন। স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাসায় চাঁদা না পেয়ে গুলি করার ঘটনাও উল্লেখ করেন।’
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশীয় অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুঠোফোন এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামে আঘাত করতে দেখা যায়। এ সময় তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান।
ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ডিডিএনের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, ‘হঠাৎ ১৫ থেকে ২০ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। এ সময় কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় তারা।’ চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
সন্ত্রাসী ইমনের খুঁটির জেহার কোথায় ?
মোবারক হোসেন ওরফে ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাঁকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি।
পুলিশের ভাষ্য, মোবারক হোসেনের বাহিনী অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছে- এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাঁকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাদের একজন মোবারক হোসেন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় মোবারক হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শূটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন তার হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলেও তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
