ক্যারিয়ারে সফল হতে নিয়মিত ছুটি নিতে শিখুন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০১:১৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
অনেকের ধারণা, জীবনে সফল হতে হলে দিন-রাত নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তাই যত বেশি সময় অফিসে বা কাজে দেওয়া যাবে, সাফল্যও তত দ্রুত ধরা দেবে। এমন বিশ্বাস এখনো অনেকের মধ্যে রয়েছে। আবার অনেক কর্মী প্রয়োজন থাকলেও ছুটি নিতে সংকোচ বোধ করেন, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানে ছুটি নেওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনে সফল থাকতে শুধু কঠোর পরিশ্রম নয়, নিয়মিত বিরতি ও পরিকল্পিত ছুটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটানা বিশ্রামহীনভাবে কাজ করলে শরীর ও মনে ক্লান্তি জমতে শুরু করে। এর ফলে মনোযোগ কমে যায়, ভুলের পরিমাণ বাড়ে এবং কাজের প্রতি আগ্রহও ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত চাপ একজন কর্মীকে আরো দক্ষ করে তোলে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার কর্মক্ষমতা ও ক্যারিয়ারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাড়ছে মানসিক চাপ
বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত কাজের চাপকে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলেই বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি।
২০২৪ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশ মানসিক চাপ এবং ৪০ শতাংশ ঘুমের সমস্যাকে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের অর্ধেকেরও বেশি বার্নআউট (দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি) সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ছুটি নেওয়া।
আরো পড়ুন : বর্ষায় শখের বাগানের যত্ন নেবেন যেভাবে
ছুটির ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার ফ্র্যাঙ্কলিন কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের মনস্তত্ত্ব বিভাগের গবেষকেরা বিশ্বের ৯টি দেশের ৩২টি গবেষণার ২৫৬টি তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সাইকোলজিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছুটি কাটানোর সুফল শুধু ছুটির সময় নয়, কর্মস্থলে ফিরে আসার পরও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মস্তিষ্কেরও প্রয়োজন বিশ্রাম
মানুষের মস্তিষ্ক একটানা একই গতিতে কাজ করার জন্য তৈরি নয়। দীর্ঘ সময় একই রুটিনে কাজ করতে থাকলে মানসিক ক্লান্তি জমে। শুরুতে বিষয়টি বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে মনোযোগ কমে, ছোটখাটো ভুল বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কয়েক দিনের বিরতি মস্তিষ্ককে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়। ফলে কাজে ফিরে নতুন উদ্যম, বাড়তি মনোযোগ এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করা সহজ হয়।
বার্নআউটের ঝুঁকি কমে
অতিরিক্ত কাজের চাপ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্লান্তি মিলেই তৈরি হয় বার্নআউট। এতে কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা এমনকি শারীরিক অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ছুটি শরীর ও মনকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ দেয়, ফলে বার্নআউটের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
বাড়ে সৃজনশীলতা
একই পরিবেশে দীর্ঘদিন কাজ করলে নতুন চিন্তার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ছুটির সময় নতুন জায়গায় ভ্রমণ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বা নিজের পছন্দের কাজে যুক্ত হওয়া মস্তিষ্ককে নতুন অভিজ্ঞতা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছুদিন কাজ থেকে দূরে থাকার পর অনেকেই নতুন ধারণা ও সৃজনশীল চিন্তা নিয়ে কর্মস্থলে ফেরেন। বিশেষ করে পরিকল্পনা, লেখালেখি, ডিজাইন ও সমস্যা সমাধানমূলক কাজে এর সুফল বেশি দেখা যায়।
সম্পর্ক হয় আরো দৃঢ়
কাজের ব্যস্ততায় পরিবার, বন্ধু কিংবা নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ছুটি সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ এনে দেয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়, যা পরোক্ষভাবে কর্মজীবনের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উৎপাদনশীলতা বাড়ে
অনেকে মনে করেন, ছুটি নিলে কাজ পিছিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে বিশ্রাম নিয়ে ফিরে এলে মনোযোগ, কর্মদক্ষতা এবং কাজের মান—সবই উন্নত হয়। সতেজ মন নিয়ে কাজ করলে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হয় এবং ভুলের সংখ্যাও কমে।
শুধু ভ্রমণ নয়, প্রয়োজন বিশ্রাম
ছুটি মানেই দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া নয়। বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নেওয়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, রান্না করা, বাগান করা কিংবা পরিবারের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোও সমান কার্যকর হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু সময়ের জন্য কাজের চাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং মানসিকভাবে সতেজ হয়ে ওঠা।
পরিকল্পনা করে কাজে ফেরা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দীর্ঘ ছুটি শেষে অফিসে ফিরেই অতিরিক্ত কাজের চাপ না নিয়ে এক থেকে দুই দিনের একটি ‘বাফার টাইম’ রাখা ভালো। এতে কাজে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয় এবং ছুটির ইতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী থাকে।
দীর্ঘমেয়াদে সফল ক্যারিয়ার গড়তে কঠোর পরিশ্রম যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রামও। তাই নিজের সুস্থতা ও কর্মদক্ষতা ধরে রাখতে প্রয়োজনমতো ছুটি নেওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া, মেন্টাল হেলথ।
