আইএমএফের নতুন ঋণচুক্তি চলতি বছরেই হওয়ার ইঙ্গিত
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি বছরেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি হতে পারে। ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন (৬০০ থেকে ৬৫০ কোটি) ডলারের নতুন এই ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে।
সরকারের অনুরোধে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির আকার, ঋণের পরিমাণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রতিশ্রæতির বিষয়গুলো আগামী কয়েক মাসে আলোচনা হবে।
গত বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি দলটি সফরের শেষদিন আইএমএফের কর্মকর্তা আইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী’র সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে আইএমএফ জানায়, এই তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেয়া হয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এসব চ্যালেঞ্জকে আরো তীব্র করেছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘেœর কারণে দেশে আবারো মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ায় সরকারের আগেই সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর আরো চাপ তৈরি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী রয়েছে, তারপরও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বহিঃখাতের ভারসাম্য রক্ষায় চাপ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আইএমএফ স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলাদেশকে রাজস্ব আয় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যদিকে সরকারও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় একসঙ্গে কঠোর সব শর্ত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সংস্কার হবে ধাপে ধাপে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকার আগের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়। এই ঋণের অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেই নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সহজ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন কর্মসূচির ভিত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়ন হবে নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে।
সরকারের মতে, একসঙ্গে কঠোর শর্ত বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বাস্তবসম্মত সময়সূচি অনুযায়ী সংস্কার এগিয়ে নেয়াই হবে কৌশল।
জানা যায়, জুলাইয়ের এই সফরের পর আগামী কয়েক মাসে আইএমএফের সঙ্গে একাধিক ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হবে। অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে। নভেম্বরে আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।
সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে এবং ২০২৭ সালের শুরুর প্রথম দুই মাসের মধ্যে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতেই প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
