দেশে সংখ্যালঘু হত্যা বেড়েছে, নিরসন হয়নি নিরাপত্তাহীনতার
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের মাসিক গড় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪৪ জন হত্যার শিকার হয়েছে, অর্থাৎ মাসে গড়ে ৭ দশমিক ৩৩টি। বিপরীতে ২০২৫ সালের পুরো বছরে ৬৬টি হত্যাকাণ্ডের হিসাবে মাসিক গড় ছিল ৫ দশমিক ৫টি। একই সময়ে জমি দখল বা দখলচেষ্টার ঘটনাও মাসিক গড়ে বেড়েছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ তথ্য তুলে ধরে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ। আরো উপস্থিত ছিলেন- সংগঠনের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও; সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ, মিলন কান্তি দত্ত, রঞ্জন কর্মকার, ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, হীরেন্দ্রনাথ সমাজদার হীরু; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্র নাথ বসু; সাংগঠনিক সম্পাদক দিপংকর ঘোষ, পদ্মাবতী দেবী; যুব বিষয়ক সহসম্পাদক বলরাম বাহাদুর; সহশিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক অর্জুন বৈদ্য; ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিপংকর চন্দ্র শীল প্রমুখ।
পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের মাসিক গড় বাড়লেও নারী নির্যাতন, উপাসনালয়ে হামলা এবং বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার মাসিক গড় কমেছে।
সংগঠনের হিসাবে, এই সময়ে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ সংখ্যালঘু নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৫টি। উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, দুর্গাপূজার মণ্ডপে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ১৫টি ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। এছাড়া বছরের প্রথম ৬ মাসে জমি দখল বা দখল-চেষ্টার ১৫টি ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও প্রতিমা লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ৪৭টি ঘটনা ঘটেছে। অপহরণ, চাঁদাবাজি, গুম, নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং বাড়িঘর, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখলের অভিযোগসহ আরো কয়েক ডজন ঘটনার তথ্যও সংগঠনটি তুলে ধরে।
সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের নেতারা বলেন, কিছু সূচকে ঘটনার সংখ্যা কমলেও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা দূর হয়নি। অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তাই সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
মনীন্দ্র বলেন, বিভিন্ন শ্রেণির ঘটনার সংখ্যায় তারতম্য থাকলেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। তার অভিযোগ, নিগ্রহের শিকার ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রেই বিচার পান না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
ঐক্য পরিষদের পক্ষে ৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। সেগুলো হলো- সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন; জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন; অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগে যাবতীয় আমলাতান্ত্রিক বাধা অপসারণ করে ট্রাইব্যুনালের রায়ের আলোকে জমির মালিকানা ও দখল ভুক্তভোগীদের বরাবরে অনতিবিলম্বে প্রত্যর্পণ; বিগত সাত দশকের অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়ন, বৈষম্যের কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ‘অগ্রসরমান জনগোষ্ঠী থেকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী’তে পরিণত হওয়ায় বিদ্যমান সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদের আলোকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করার লক্ষে বাংলাদেশের সংসদে ৬০টি সংসদীয় আসন নির্ধারণ করে সংখ্যালঘুদের সরাসরি ভোটে সংখ্যালঘুদের জন্যে ৬০টি আসন সংরক্ষণ; দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন; বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন ও এর পাশাপাশি সকল জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও রাষ্ট্রীয় সংস্থায় এবং পুলিশ-সামরিক বাহিনীসহ সর্বস্তরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হারে অংশীদারিত্ব-প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের যথাযথভাবে কার্যকরকরণ; সমতলের আদিবাসীদের জন্যে আলাদা ভূমি কমিশন গঠন; সকল সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের ধর্ম পালনে অধিকতর উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সরকারি ছুটিসমূহের অতিরিক্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গা পূজায় অষ্টমী থেকে দশমী-এ ৩ দিন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমায় ১ দিন ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ইস্টার সানডেতে ১ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা ও এর পাশাপাশি ধর্মীয় ট্রাস্টসমূহকে বিলোপ করে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরকরণ।
