১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তর
বাল্ক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় বাবিউবো
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তরের সব বাল্ক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে নিজেদের আওতায় রাখতে চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো)। এর ফলে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। এই বিষয়ে বাবিউবোর ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিতের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট এই আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।
ওই আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সরকারের নির্ধারিত একক ক্রেতা হিসেবে সমগ্র বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। বাবিউবো সরকারি ও বেসরকারি সব বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনে নিজস্ব উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ব্যবস্থাপনা, জ¦ালানি সমন্বয়, গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের ভর্তুকি হ্রাস, ব্যয়ভিত্তিক ট্যারিফ বাস্তবায়ন এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাবিউবো কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
বাবিউবো সরকারের নির্দেশে বিদ্যুতের একক ক্রেতা হিসেবে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে ১৩২ কেভি লেভেলে ডিপিডিসিও ডেসকো এবং ৩৩ কেভি লেভেলে বাপবিবো, নেসকো, ওজোপাডিকো লিংসহ বাবিউবোর নিজস্ব চারটি বিতরণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিক্রয় এবং ১৩২/২৩০ কেভি লেভেলে বড় বড় শিল্প কারখানায় বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে। আবেদনে আরো বলা হয়, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন
ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রস্তাবনা অনুসারে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিদ্যুতের একক ক্রেতা হিসেবে বাবিউবোকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের আলোকে বাবিউবো উৎপাদন সেক্টরে, নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে পিপিএ সংশোধনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে শিল্পায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ প্রেক্ষাপটে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও একক ক্রেতা হিসেবে বাবিউবো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিজস্ব মালিকানাধীন কোম্পানি পিজিবি পিএলসির মাধ্যমে সঞ্চালন করে অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে সরবরাহ করলে ভর্তুকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত হবে।
ওই আবেদনে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে যৌক্তিকতা ও প্রস্তাব তুলে ধরে বলা হয়, একক ক্রেতা হিসেবে সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাবিউবোকে এনার্জি চার্জের পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। তাছাড়া পিজিবি পিএলসি নেটওয়ার্ক লিমিটেশনের দরুন ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রংপুর, সৈয়দপুরসহ বেশ কিছু এলাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে হয়। বর্তমানে বাবিউবোর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ দশমিক ৬০ টাকা। যার বিপরীতে ১৩২/২৩০ কেভি লেভেল বাল্ক পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রয় মূল্য গড়ে ১০ দশমিক ১১ টাকা এবং খুচরা বিদ্যুৎ বিক্রয় মূল্য গড়ে ১২ দশমিক ৬৪ টাকা (ফ্ল্যাট রেট)। ফলে বাবিউবো ব্যতীত অন্য কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা কর্তৃক ২৩০/১৩২ কেভি লেভেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে একক ক্রেতা হিসেবে বাবিউবোর বছরে প্রতি মেগাওয়াটে প্রায় ২ দশমিক শূন্য থেকে ২ দশমিক ২ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। অপরদিকে একক ক্রেতা ও সরকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিডিবি কর্তৃক উক্ত লেভেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ হলে উল্লিখিত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না।
এখানে উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ৫টি সংস্থার প্রায় ২০০০ মেগাওয়াটের ১৯টি সংযোগ অনুমোদনের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে মর্মে জানা যায়। এ সংযোগগুলো চালু হলে বিউবোর প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হবে- যা বাংলাদেশে সরকারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হুমকিস্বরূপ।
একক ক্রেতা হিসেবে সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাবিউবোকে এনার্জি চার্জের পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়, যা জেনারেশন কস্টিং-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। অথচ ১৩২/২৩০ কেভি বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব সংস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপাদন পরিকল্পনা, ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ বা গ্রিড পরিচালনাসহ কোনো আর্থিক ও কারিগরি দায়ভার বহন করে না, তারাও ডিমান্ড চার্জ ও জামানত গ্রহণ করে থাকে। ফলে একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে বাবিউবোর প্রাপ্য রাজস্ব হ্রাস পায় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে যায়। বিপরীতে উক্ত ডিমান্ড চার্জ ও জামানতের রাজস্ব বিপিডিবি পেলে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
এতে আরো বলা হয়, ১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ লেভেলে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য অন্যান্য বিতরণ সংস্থার নিজস্ব কোনো গ্রিড অবকাঠামো, সঞ্চালনব্যবস্থা কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিদ্যমান নেই। ফলে উক্ত ভোল্টেজ স্তরে বাল্ক বিদ্যুৎ সরবরাহ বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে তাদের কোনো বাস্তবিক, কারিগরি বা নীতিগত এখতিয়ার সৃষ্টি হয় না। এ ধরনের দায়িত্ব অর্পণ বিদ্যমান কাঠামো, বিইআরসি ট্যারিফ আদেশ এবং বিদ্যুৎ খাতের দায়িত্ব বণ্টনের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ; বরং এটি দায়িত্বের অপ্রয়োজনীয় ওভারল্যাপ, সমন্বয়হীনতা এবং আর্থিক অদক্ষতা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়, বিদ্যমান আইন, বিইআরসি ট্যারিফ আদেশ, সরকারের নীতি এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক বাস্তবতা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তরের বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) কর্তৃক পরিচালিত হওয়াই সর্বাধিক যৌক্তিক, অর্থনৈতিক এবং নীতিসম্মত ব্যবস্থা। বিদ্যমান আইন, নীতিমালা ও দায়িত্ব বণ্টন কাঠামোর বাইরে অতিরিক্ত কোনো সংস্থাকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করলে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি, সমন্বয়হীনতা, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়, রাজস্ব বিভাজন এবং সরকারের ভর্তুকি বাড়বে। একই সঙ্গে এটি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক পুনর্গঠন কার্যক্রম এবং বিনিয়োগবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
তাই জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তরের সব বাল্ক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে বাবিউবোর আওতায় রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় একান্ত প্রয়োজন বলে অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ওই আবেদনে উল্লেখ করেছেন।
