×

শেষের পাতা

দেবাশীষ দত্তকে শেষ বিদায় জানালেন অশ্রæসজল স্বজনরা

Icon

কাগজ প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসী, দীর্ঘদিনের সহকর্মীসহ হাজার হাজার মানুষের অশ্রæসজল নয়নে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম হোসেনকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। গত শনিবার মরদেহ দেশে পৌঁছালে রাতে সৎকার ও দাফন সম্পন্ন হয়।

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর প্রায় ৯১ ঘণ্টা পর গত শনিবার রাতে তাদের মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী সাংবাদিক ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে শেষ বিদায় জানানো হয়। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়া শহরের আড়–য়াপাড়া বাহাদুর আলী বিশ্বাস সড়কের বাসায় পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর খবর পেয়ে মুহূর্তেই বাড়িতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই পরিবারের চার সদস্যের নিথর দেহ একসঙ্গে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। শোকের আবহ নেমে আসে পুরো এলাকায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক নেতারা মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খান। মানুষের ভিড়ে পরিবার সনাতনি রীতি অনুসরণ করা সম্ভব না হওয়ায় সেখান থেকে মরদেহ আড়–য়াপাড়া তরুণ সংঘ পাঠাগার ক্লাব চত্বরে নিয়ে সেখানে পুরোহিতরা ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন

করেন। এর পর শেষ বারের মত এক নজর দেবাশীষকে দেখাতে তার বাসায় নিয়ে আসা হয়। এখানে পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে শেষ বিদায় নেয়ার পরে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার তিন বছর বয়সী শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করা হয়। অন্যদিকে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও তার বাবা আকরাম হোসেনের জানাজা কুষ্টিয়ার কুঠিপাড়ায় অবস্থিত উপজেলা মডেল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে তাদের মরদেহ কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

‘বাবা-মা খেলনা নিয়ে ফিরবে’, অপেক্ষায় ছিল ছোট্ট পাখি

এই মর্মান্তিক ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র কন্যা পাখির কান্না। বাবা-মা, ছোট ভাই ও নানার মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। কয়েক দিন ধরে বাবা-মায়ের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিল পাখি। তার ধারণা ছিল, বাবা-মা বিদেশ থেকে তার জন্য খেলনা, চকলেট ও নতুন জামাকাপড় নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয় চারটি নিথর দেহ ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

কলকাতার আগুনে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্বজনদের অনেকেই শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখার সুযোগও পাননি। প্রিয়জন হারানোর বেদনার সঙ্গে এই বাস্তবতা স্বজনদের শোককে আরো ভারী করে তুলেছে।

সহকর্মী সাংবাদিকদের চোখে অশ্রæ : দেবাশীষ দত্তের শেষ বিদায়ে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সহকর্মী সাংবাদিকদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ সান্ত¡না দেন পরিবারের সদস্যদের, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রিয় সহকর্মীর নিথর দেহের পাশে। সহকর্মীদের ভাষ্য, দেবাশীষ ছিলেন সদালাপী, হাসিখুশি ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক। স্থানীয় মানুষের সমস্যা, নাগরিক দুর্ভোগ এবং জনস্বার্থের নানা বিষয় সংবাদে তুলে ধরতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। তার এমন আকস্মিক মৃত্যু কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।

গত শনিবার সকালে কুষ্টিয়ার একদল সাংবাদিক যশোরের বেনাপোল সীমান্তে গিয়ে সহকর্মী দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের মরদেহ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

পরিবারের পাশে জেলা প্রশাসন : নিহতদের শেষকৃত্য ও দাফনের সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হারুন অর রশিদ নিহত চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন।

গত ৩ আগস্ট স্ত্রী আফসানা শারমীন ও সন্তানদের নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরুতে যান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। সেখানে নারায়ণ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তারা। অন্যদিকে দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেনও ছোট জামাই ফিরোজের চিকিৎসার জন্য ৫ আগস্ট বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে ফিরোজ ১৬ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরে এলেও আকরাম হোসেন মেয়ের পরিবারটির সঙ্গে থেকে যান।

চিকিৎসা শেষে দেবাশীষ, তার স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর ১৮ আগস্ট বিমানযোগে বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় পৌঁছান। সেদিন রাতে তারা মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই আবাসিক হোটেলে ওঠেন। পরদিন ১৯ আগস্ট তাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকান্ড তাদের জীবন কেড়ে নেয়।

ভালোবাসার বিয়ের পর দুই ধর্মের রীতিতে সংসার : পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় বছর আগে পরিবারের মতের বাইরে দেবাশীষ দত্ত ও আফসানা শারমীনের বিয়ে হয়। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে শুরুতে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। আফসানা শারমীনের বাবা আকরাম হোসেন মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে শারমীন দেবাশীষের সঙ্গে সংসার করার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় তাকে আর ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি বজায় রেখেই সংসার করছিলেন। তাদের দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো, কলকাতার সেই অগ্নিকাণ্ডে একই সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী, তাদের শিশুসন্তান এবং শ্বশুরের মৃত্যু।

সাংবাদিকতা ও কর্মজীবন : নিহত দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কর্মজীবনে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা, মানুষের দুর্ভোগ, অনিয়ম ও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশে সক্রিয় ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তার পরিচিতি ছিল সাহসী, দায়িত্বশীল ও সদাহাস্যোজ্জ্বল সাংবাদিক হিসেবে। দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেন কুষ্টিয়া ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর কর্মচারী ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

প্রবাসীদের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে নতুন নিয়ম ওমানের

প্রবাসীদের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে নতুন নিয়ম ওমানের

আমাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে

রায়ের পর নুসরাতের মা আমাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে

জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায় বিএনপি: আইনমন্ত্রী

জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায় বিএনপি: আইনমন্ত্রী

পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মার্কিন বিনিয়োগ চায় সরকার

পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মার্কিন বিনিয়োগ চায় সরকার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App