খুন করে বাসায় বসে খেজুর ও শসা খায় খুনিরা : পুলিশ
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাস (১৯) নামে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার ভোররাতে রংপুর নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান থেকে তাদের আটক করা হয়।
আটককৃতদের বাড়ি মাছুয়াপাড়ায়। তারা এলাকার চিহ্নিত মাদকসেবী বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করা হয়। এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘আটককৃতদের মধ্যে ইয়াবা খাওয়ার আলামত পেয়েছি। খেজুরের বিচি পেয়েছি। ফ্রিজ থেকে বের করে শসা খেয়েছে তারও আলামত পেয়েছি। খুন শেষের পর তারা গোসল করে। আগুনে টেস্ট করা চুড়ি পেয়েছি। তখন মনে হয়েছে গোল্ডের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত থাকতে পারে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা আসামি গ্রেপ্তারে সমর্থ হয়েছি।’
জানা গেছে, শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অবসরের পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসাবে কাজ করতেন গণপতি চক্রবর্তী। দোতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন তিনি। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার তাদের সঙ্গে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সবশেষ কথা হয়েছিল। এরপর শনিবার রাত পর্যন্ত মোবাইল বন্ধ পেয়ে তারা ওই বাড়িতে এসে মেইন দরজা বন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে তালা ভেঙ্গে ঘরের ভেতরে ঢুকে একের পর এক মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
নিহত শিক্ষকের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমার ভাই খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার কোনো শত্রæ ছিল না। এভাবে কেন তাকে খুন করা হবে। আমরা চাই সঠিক তদন্ত করে সত্যিটা বের করা হোক।’
রংপুরের পুলিশ অবশ্য দাবি করছে, তারা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই জনকে গতকাল ভোরে আটক করেছেন। রংপুর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, গণপতি চক্রবর্তী সম্মানিত মানুষ ছিলেন এবং কারো সঙ্গে তাদের কোনো বিবাদ ছিল না। তাকে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত
তথ্য তারা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে তারা আটক করেছেন এবং তারা পরস্পরের আত্মীয় ও একই এলাকার। এর মধ্যে একজন সেখানকার একটি স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করতেন।
রংপুর পুলিশ কমিশনার আরো বলেন, ‘পাশের নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে এসেছিল দুজন। ওই ছাদে তারা ইয়াবা সেবন করে। এ সময় গণপতি শব্দ শুনে খালি গায়ে উপরে যান। তার ঘাড়ে গামছা ছিল। তিনি ওই দুজনকে চ্যালেঞ্জ করলে তারা তার গলার গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তখন তিনি বাঁচার জন্য চেষ্টা করেন। এতে শব্দ হয়। শব্দ শুনে প্রীতিলতা চক্রবর্তী উপরে আসার চেষ্টা করেন। এ সময় ওই দুজন গামছা পেঁচিয়ে সিঁড়ির মধ্যেই তাকেও হত্যা করে।’
তার বর্ণনা অনুযায়ী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাদের মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে ওই দুজন তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করে। এরপর প্রার্থীর ছোট ভাই ১২ বছর বয়সী প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিতে হত্যা করে ওই দুজন।
‘এরপর ছোটো ছেলের বাথরুমে গিয়ে তারা গোসল করে। পরে তাদের ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর খায়। সেখানে ইয়াবা সেবন করে। এসব আলামত আমরা পেয়েছি। এরমধ্যে সকাল হওয়ার পর তারা বেরিয়ে যাবার সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। জিনিসপত্র লুট করে জুমার নামাজের সময় তারা বেরিয়ে যায়,’ বলছিলেন রংপুরের পুলিশ কমিশনার।
তিনি জানান, যাওয়ার সময় বাসার ভেতরের সবকিছু ওই দুজনই ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে যায়। বাসায় থাকা দুটি ফোন তারা ডিটারজেন্ট দিয়ে বালতিতে ভিজিয়ে রাখে। কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা সেখানকার মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায়। পরে তাদের দেখানো মতে এগুলো উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘টানা চারটি খুন করেও খুনিদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক এবং খুনের পর বাসার ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছে তারা।’
কিন্তু দুইজন ব্যক্তি একটি বাসার চারজনকে খুন করল কীভাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে রংপুরের ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘তারা প্রথমে মাদক সেবন করেছে। এরপর একজন একজন করে খুন করেছে। আমরা দুজনকে একসঙ্গে ও আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করে একই তথ্য পেয়েছি। ঘটনার পর ৬/৭ ঘণ্টা তারা ভেতরেই অবস্থান করেছে।’
পুলিশের এসব বর্ণনার বিষয়ে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তাদের আশা পুলিশ সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আটক করবে।
রংপুর মহানগরের কোতোয়ালি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী নিহত শিক্ষকের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।
