নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত ৯৫, ভারতীয়সহ ৩৪১ পর্যটক নিখোঁজ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
আকস্মিক বন্যার পর নদীর তীরে কাদাপানিতে আংশিক তলিয়ে আছে ঘরবাড়ি, ত্রিশূলি, নেপাল। ছবি: সংগৃহীত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবারের আকস্মিক বন্যায় নেপালের রসুয়া জেলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ওই এলাকা ও রাজধানী কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে ৬৫ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার পর ৩৪১ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় ও ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।
উত্তর নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভোতেকোশি নদী চীন সীমান্তের দিকে গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৯টার দিকে নদীর পানি দুই কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি প্লাবিত ও বিধ্বস্ত হয়। পানির স্রোতে সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বরফধস থেকে বন্যার আশঙ্কা
আকস্মিক এই বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে একটি বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর ফলে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ভোতেকোশি লেন্দে নদীর একটি উপনদী।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের কাছে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে জিরং বন্দরে। এতে নেপাল সীমান্তবর্তী শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জিরং কাউন্টিতে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ৩৩১
নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীন—উভয় দেশের কাছেই সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
নিখোঁজ পর্যটক ও তীর্থযাত্রী
নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া তীর্থযাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁরা তিব্বতের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন।
কাঠমান্ডুভিত্তিক টাচ কৈলাস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, ৯৩ জন নেপালিসহ মোট ৩৯০ জন তীর্থযাত্রীর ওই সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। তবে বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং তিনজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। আরও ১১১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আটজন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন। আরও ১০ জন সেখানে আটকা পড়েছেন। তাঁদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

ব্যাহত উদ্ধার অভিযান
রসুয়া জেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। বন্যার পর জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্গত স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারেনি।
কান্তিপুরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত রসুয়ায় ত্রাণ নিয়ে তিনটি হেলিকপ্টার রওনা হলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেগুলো কাঠমান্ডুতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত, কারণ জানাল পররাষ্ট্র দপ্তর
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বস্নেত জানিয়েছেন, বন্যার পানি না কমা পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করা সম্ভব হবে না।
টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে বন্যার পানিতে ভেঙে পড়া বাড়িঘর, ভেসে যাওয়া গাড়ি এবং পানির স্রোতে একটি লোহার সেতু ভেসে যেতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পানির তোড়ে পুরো গ্রাম তলিয়ে গেছে।
রসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গ্রাম ও বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়ার পর তিনি ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
রসুয়া জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বি কে রয়টার্সকে বলেন, চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে। নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। তাঁর নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।

বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা
পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় নেপালের বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত বছরও ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। পরে জানা যায়, একটি হিমবাহের হ্রদ থেকে ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এবারের বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তল্লাশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে বন্যা-পরবর্তী সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় নজরদারি ব্যবস্থা ও আগাম সতর্কসংকেত আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, প্রতিকূল আবহাওয়া ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্গত এলাকায় এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
