×

বরিশাল

হাসপাতাল নিজেই ভুগছে নানা রোগে

Icon

আসাদুল ইসলাম (আসাদ), মেহেন্দিগঞ্জ (বরিশাল)

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

হাসপাতাল নিজেই ভুগছে নানা রোগে

ছবি : সংগৃহীত

প্রয়োজনের তুলনায় সিট কম, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসক ও নার্স সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল।

জেলার সবচেয়ে দুর্গম ও নদীবেষ্টিত উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জ। ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। যাদের বেশিরভাগই কৃষক ও মৎস্যজীবী। এই পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের একমাত্র ভরসাস্থল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হলেও নানা সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। এ ছাড়া হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রযুক্তিও নেই। বিশেষ করে আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা এক্স-রে মেশিন নেই। এমনকি সিবিসি পরীক্ষারও সুযোগ নেই হাসপাতালে। ফলে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে বাড়তি টাকা দিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। টাকার অভাবে অনেক অসচ্ছল পরিবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কাটা-ছেঁড়া বা জখমের কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বরিশাল সদরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এমন কিছু রোগী থাকেন, যাদের জন্য প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলা সদর থেকে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। দ্রুতগামী যান স্পিডবোটে গেলেও সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাসপাতালের রোগী পরিবহনের জন্য একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হলেও অবহেলা ও অযত্নে কিছুদিন পর সেটিও অচল হয়ে যায়। এখন ভরসা ভাড়ায় চালিত স্পিডবোট। রিজার্ভ স্পিডবোট নিয়ে বরিশাল যেতে গুনতে হয় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। সামর্থ্য না থাকায় অনেক রোগী লঞ্চে যাতায়াত করেন। অনেক সময় বরিশাল নেওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অসুস্থ ব্যক্তি।

এ ছাড়া হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিই অচল। অন্যটিও চলছে অনেকটা খুঁড়িয়ে। একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পুরো উপজেলার সেবা দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ। একজন রোগীকে পৌঁছে দেওয়ার পর অন্য রোগী পরিবহনের সুযোগ পান চালক। ততক্ষণ রোগী নিয়ে অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের। বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হয় থ্রি-হুইলার অটোরিকশা। রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে অসুস্থ মানুষ নিয়ে পড়তে হয় চরম বিপাকে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। কখনো কখনো ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩০ থেকে ১৪০ জনে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন। ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় হাসপাতালে দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। সিট না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।

এ ছাড়া হাসপাতালের টয়লেটগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। অপরিচ্ছন্নতার কারণে ভেতরে প্রবেশের মতো পরিবেশ নেই। কোনো কোনো টয়লেটের দরজার লক আটকায় না। আবার কোনো কোনো টয়লেটের দরজা ভেঙে যাওয়ায় ভেতরের সবকিছু বাইরে থেকে দেখা যায়।

চিকিৎসা নিতে আসা উলানিয়ার রাজাপুর এলাকার মুবিন বলেন, “দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে টিকিট সংগ্রহ করেছি। এরপর আবার ডাক্তার দেখানোর জন্য লম্বা সিরিয়াল। হাসপাতালে ডাক্তার কম থাকায় রোগীদের চাপে চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো পরীক্ষা দিলে সেগুলো বাড়তি টাকা দিয়ে ক্লিনিক থেকে করাতে হয়।”

পাতারহাট বন্দরের বাসিন্দা সাকিব বলেন, “কাঁচের আঘাতে মেয়ের হাত কেটে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর দ্রুত বরিশাল নিয়ে যেতে বলা হয়। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা হাসপাতালে নেওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের নির্দেশে একজন ওয়ার্ডবয় মেয়ের হাত সেলাই করে দেন। ওই দিনই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে আসি। মেহেন্দিগঞ্জ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক যে সেবা দিতে পারলেন না, একই সেবা বরিশালের একজন ওয়ার্ডবয় কীভাবে দিলেন?”

এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালে মোট ৫০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। ৩৬ জন নার্সের বিপরীতে আছেন মাত্র ২১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন মাত্র দুজন। নেই কোনো ওয়ার্ডবয়। সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক বলেন, “নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় চিকিৎসক ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন উপায়ে বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বাস্তবে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। যার কারণে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে আমাদের।”

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফও) ডা. মোহাম্মদ ইমরানুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল সংকট রয়েছে। ৫০ জনের বিপরীতে ডাক্তার আছেন মাত্র ছয়জন। ছয়জন ডাক্তার দিয়ে তো ৫০ জনের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকটের কারণে সেবা প্রদানে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। ইতোমধ্যে সচিব মহোদয় ও বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর শূন্য পদে নিয়োগের জন্য আমরা চিঠি পাঠিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে করার মেশিন নেই, এটি সত্য। এ ছাড়া সেল কাউন্টার না থাকায় সিবিসিসহ অনেক পরীক্ষা আমরা করতে পারছি না। শূন্য পদে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বরাদ্দ পেলে আমরা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারব বলে প্রত্যাশা রাখি।”

এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বর্তমান অবস্থা জেনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সংবাদ প্রকাশের পর পঞ্চগড়ে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ

সংবাদ প্রকাশের পর পঞ্চগড়ে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ

বোমা বিস্ফোরণে দগ্ধ হনুফার ৯ দিনের লড়াই শেষ

বোমা বিস্ফোরণে দগ্ধ হনুফার ৯ দিনের লড়াই শেষ

সিলেটে প্রসূতিদের চিকিৎসায় নতুন উদ্যোগ, বিনামূল্যে মিলবে ওষুধ-পরীক্ষা

সিলেটে প্রসূতিদের চিকিৎসায় নতুন উদ্যোগ, বিনামূল্যে মিলবে ওষুধ-পরীক্ষা

হাসপাতাল নিজেই ভুগছে নানা রোগে

হাসপাতাল নিজেই ভুগছে নানা রোগে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App