প্রযুক্তির যুগে বদলে যাচ্ছে যোগ্যতার সংজ্ঞা
নাজমুল হাসান
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
ছবি: গ্রাফিক্স ভোরের কাগজ
সময় বদলাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে কাজের ধরনও। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল দক্ষতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করার বিকল্প নেই।
বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত যে, কয়েক বছর আগের নতুন প্রযুক্তিই এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এআই সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। শিক্ষা, ব্যবসা, গবেষণা, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যাংকিং, যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করাই এখন ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নয়। নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে সময়ের সঙ্গে নিয়মিত হালনাগাদ করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইন্টারনেট প্রবেশের হার ৭৩ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল ১২ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার এবং আইএসপি ও পিএসটিএন-ভিত্তিক ব্রডব্যান্ড গ্রাহক ১ কোটি ৫৪ লাখ।
তবে ইন্টারনেটের বিস্তার আর প্রযুক্তিতে দক্ষতা; দুটো এক বিষয় নয়। হাতে স্মার্টফোন থাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা কিংবা নিয়মিত ইন্টারনেটে যুক্ত থাকলেই একজন মানুষ ডিজিটালভাবে দক্ষ হয়ে যান না। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) ডিজিটাল দক্ষতাকে তথ্য ও ডেটা-সাক্ষরতা, যোগাযোগ ও সহযোগিতা, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, নিরাপত্তা এবং সমস্যা সমাধানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিবেচনা করে। তাদের সর্বশেষ তুলনীয় বৈশ্বিক তথ্যের হিসাবে যোগাযোগ ও সহযোগিতায় অন্তত মৌলিক দক্ষতার হার ৮৩ শতাংশ, তথ্য ও ডেটা-সাক্ষরতায় ৭৬ শতাংশ, সমস্যা সমাধানে ৭০ শতাংশ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে ৬০ শতাংশ এবং নিরাপত্তায় ৫৭ শতাংশ। তবে আইটিইউ একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে এসব তথ্য সব দেশের জন্য সমানভাবে পাওয়া যায় না।
এই বাস্তবতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া এবং সেই প্রযুক্তিকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করার সক্ষমতা এক নয়। একজন শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে শুধু বিনোদন নিতে পারেন, আবার একই ইন্টারনেট ব্যবহার করে অন্য একজন গবেষণা, অনলাইন শিক্ষা, ভাষা শেখা কিংবা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। তাই আগামী দিনের মূল প্রশ্ন শুধু ‘কে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে’ নয়; বরং ‘কে ইন্টারনেটকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছে’।
এআইকে ভয় নয়, বুঝে ব্যবহার
প্রযুক্তির বর্তমান পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই টুল সাধারণ মানুষের জন্যও অনেক প্রযুক্তিগত কাজকে সহজ করেছে। লেখা সম্পাদনা, অনুবাদ, ধারণা তৈরি, তথ্য সংগঠিত করা, গবেষণার প্রাথমিক সহায়তা, উপস্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি কিংবা ডেটা বিশ্লেষণের মতো কাজে এসব টুল ব্যবহার করা যায়।
তবে এআইকে ব্যবহার করার অর্থ অন্ধভাবে তার ওপর নির্ভর করা নয়। এআইয়ের তৈরি তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হতে পারে। ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতার গুরুত্বও তত বাড়বে। একটি এআই টুল কোনো উত্তর তৈরি করে দিলেই সেটি সত্য -এমন ধারণা বিপজ্জনক। বরং ব্যবহারকারীকে জানতে হবে কী প্রশ্ন করতে হবে, প্রাপ্ত তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীভাবে সংশোধন করতে হবে।
অর্থাৎ এআই যুগে মানুষের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে -এমন সরল ধারণার চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। প্রযুক্তি অনেক কাজের পদ্ধতি বদলে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের বিচারবোধ, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন থেকেই যায়।
কর্মবাজারের চাহিদাও বদলাচ্ছে
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তির প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ থেকে। বিশ্বের ৫৫টি অর্থনীতি ও ২২টি শিল্পখাতের এক হাজারের বেশি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিকে ৮৬ শতাংশ নিয়োগদাতা তাদের ব্যবসা রূপান্তরকারী প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন। প্রতিবেদনে এআই ও বিগ ডেটা, নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি-সাক্ষরতাকে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতের প্রতিটি মানুষকে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হতে হবে। বরং যে যে পেশায় মানুষ কাজ করছেন, সেই পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
একজন শিক্ষককে হয়তো এআই দিয়ে শিক্ষাসামগ্রী তৈরির পদ্ধতি জানতে হবে। একজন সাংবাদিককে তথ্য যাচাই, গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণের নতুন পদ্ধতি আয়ত্ত করতে হবে। একজন উদ্যোক্তাকে ডিজিটাল মার্কেটিং ও ব্যবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণে দক্ষ হতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে অনলাইন গবেষণা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং এআই-সহায়ক শেখার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।
অর্থাৎ প্রযুক্তিগত দক্ষতা এক ধরনের একক পেশা নয়; বরং প্রায় সব পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া একটি মৌলিক সক্ষমতা।
বাংলাদেশে অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষতাও দরকার
বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ বাড়লেও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে এখনও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ৪জি মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা পুরো জনসংখ্যায় পৌঁছালেও তখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছিলেন প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ নেটওয়ার্কের আওতা থাকা মানেই সবাই কার্যকরভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন -এমন নয়। ডিভাইসের দাম, ইন্টারনেটের খরচ এবং ডিজিটাল দক্ষতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআইয়ের সুফল পেতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, স্থানীয়ভাবে প্রাসঙ্গিক ডেটা, ডিজিটালভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠী এবং প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা -এই ভিত্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এআইয়ের শুধু ভোক্তা হয়ে থাকতে পারে; নিজেদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
সুতরাং বাংলাদেশে শুধু ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলেই হবে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রযুক্তি শিক্ষা জোরদার করতে হবে। শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্যও প্রযুক্তি শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে।
নীতির পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা
বাংলাদেশেও এআই নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত প্রস্তুতি চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে ন্যাশনাল এআই পলিসি বাংলাদেশ ২০২৬-৩০ (ড্রাফ্ট ভি১.১) প্রকাশ করা হয়েছে। এটি খসড়া নথি -তাই এটিকে চূড়ান্ত জাতীয় নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। তবে এআইকে কেন্দ্র করে জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ যে নেওয়া হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এবং সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-ও আইনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
ফলে প্রযুক্তি শেখানোর সময় শুধু কোনো সফটওয়্যার বা এআই টুলের ব্যবহার শেখালেই চলবে না। ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, অনলাইনে পাওয়া তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হবে, ভুয়া তথ্য কীভাবে শনাক্ত করতে হবে এবং এআই ব্যবহারে নৈতিক দায়িত্ব কী -এসবও প্রযুক্তি শিক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
পরিবর্তন শুরু হোক ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে
প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার জন্য একসঙ্গে অনেক কিছু শেখার প্রয়োজন নেই। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি একটি করে দক্ষতা অর্জন করা যায়। সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা নতুন কোনো সফটওয়্যার শেখা, এআই টুলের ব্যবহার অনুশীলন করা, অনলাইন কোর্স করা, তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি শেখা কিংবা নিজের পেশাগত কাজকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও সহজ করার চেষ্টা -এসবই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখার মানসিকতা। প্রযুক্তির জগতে আজকের দক্ষতা আগামীকাল পুরোনো হয়ে যেতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি শেখার চেয়েও নতুন প্রযুক্তি শেখার সক্ষমতা তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন থাকা দরকার। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল যোগাযোগ, ডেটা ব্যবহারের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মবাজারে শুধু তথ্য জানা নয়, সেই তথ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তি মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম। তবে সেই মাধ্যমকে কার্যকর করতে হলে জ্ঞান, দক্ষতা ও বিচারবোধ -তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন।
সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রযুক্তিও থেমে নেই। বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, সম্ভাবনাও আছে। আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, এআই নিয়ে নীতিগত প্রস্তুতি চলছে এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এখন থেকেই ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্র -সব পর্যায়েই প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে শুধু প্রযুক্তি নয় -প্রযুক্তিকে বুঝে, যাচাই করে এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম মানুষ। তাই আধুনিক সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তব প্রস্তুতি হলো শেখা থামিয়ে না দেওয়া এবং নিজের দক্ষতাকে নিয়মিত নতুন করে গড়ে তোলা।
লেখক: মো. নাজমুল হাসান, সাংবাদিক
