×

বাজেট

বাজেট কাঠামো, কৃষি সংকট ও জনজীবনের চাপ: নীতিগত অগ্রাধিকারের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

বাজেট কাঠামো, কৃষি সংকট ও জনজীবনের চাপ: নীতিগত অগ্রাধিকারের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের বর্তমান বাজেট কাঠামোতে একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ঋণনির্ভরতা ও সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা যেমন প্রবল হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাত- বিশেষত কৃষি- ধীরে ধীরে নীতিগত অগ্রাধিকারের কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। 

সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ করের আওতা সম্প্রসারণকে প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন প্রতিবেদনেও দেখা যায়, মোট রাজস্বের বড় অংশ এখনো পরোক্ষ করনির্ভর, যা সাধারণ ভোক্তার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- বাজেট কাঠামোতে কৃষি, উৎপাদন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সমন্বিত কৌশলের ঘাটতি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও সারসহ নিত্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ধীরগতিতে কমলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক দেশে এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও সরাসরি অনুভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে ওঠানামা করেছে, যেখানে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও বাজেট কাঠামোতে সে ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতি স্পষ্ট।

কৃষি খাত: ভর্তুকি নির্ভরতা বনাম কাঠামোগত দুর্বলতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি খাত, যা এখনো মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মসংস্থান সরবরাহ করে। অথচ কৃষি খাতে বরাদ্দ ও নীতি-সহায়তার ধরন দীর্ঘদিন ধরেই ভর্তুকি নির্ভর ও খণ্ডিত রয়ে গেছে। সারে ভর্তুকি, ডিজেলে প্রণোদনা এবং কিছু সেচ সহায়তা থাকলেও তা প্রায়শই মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকের হাতে পুরোপুরি পৌঁছায় না- এমন অভিযোগ বহুদিনের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উপকরণের মূল্য স্থিতিশীল না থাকলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেট কাঠামোয় সুনির্দিষ্টভাবে সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সরবরাহ, কৃষি ঋণে সুদের বোঝা হ্রাস কিংবা কৃষি বীমা ব্যবস্থার মতো কাঠামোগত সংস্কার খুবই সীমিত আকারে দেখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি ঋণের একটি অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে চলে যায়, ফলে প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতায় "সাবসিডি আছে কিন্তু পৌঁছায় না"-এই সমস্যাটি আরও গভীর হয়।

কৃষি আধুনিকায়ন: উৎপাদন না কি পুঁজি নির্ভরতা?

বর্তমান বাজেটে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া হলেও, এর কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অবশ্যই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক, তবে তা যদি ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের নাগালের বাইরে থাকে, তবে তা নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্র্যাক্টর, হারভেস্টার কিংবা আধুনিক সেচযন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি সহজ ঋণ ও ভর্তুকি কাঠামো না থাকে, তাহলে কৃষি উৎপাদন ধীরে ধীরে বড় পুঁজি-নির্ভর খাতে পরিণত হয়। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একইভাবে সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার বিতরণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সক্রিয় থাকায় প্রকৃত কৃষকরা অনেক সময় সরকার নির্ধারিত দামে সার পান না। ফলে ভর্তুকির একটি অংশ কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়।

খাদ্য নিরাপত্তা ও সরকারি মজুদ ব্যবস্থাপনা

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারি মজুদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু চাল, গম ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মজুদ ব্যবস্থার সক্ষমতা এখনো চাহিদার তুলনায় সীমিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (FAO) মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের ন্যূনতম খাদ্য মজুদ থাকা উচিত অন্তত তিন মাসের চাহিদার সমান, তবে বাস্তবে অনেক সময় এই সক্ষমতা ওঠানামা করে।

বাজেটে মজুদ ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের বিষয়ে স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে তা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময়।

কর্মসংস্থান ও কৃষি-ভিত্তিক শিল্পের ঘাটতি

বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন শ্রমশক্তি বাজারে প্রবেশ করে বলে বিভিন্ন শ্রম জরিপে দেখা যায়। কিন্তু কৃষি-ভিত্তিক শিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত সেই অনুপাতে বিকশিত হয়নি।

ফলে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন দেশে না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামাল রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ে। কৃষিভিত্তিক শিল্প- যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক, এবং রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্য উৎপাদন-এগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা করায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের দামে। শহর ও গ্রামে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন ভ্যাট ও করের আওতা সম্প্রসারিত হয় কিন্তু উৎপাদন খরচ কমানোর কাঠামোগত উদ্যোগ সীমিত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের ওপর প্রকৃত চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে।

নীতিগত পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন

বর্তমান বাজেট কাঠামোতে রাজস্ব আহরণ ও ঋণ পরিশোধের চাপ যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অথচ একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি- যেখানে কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কেন্দ্রে থাকবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি খাতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—

সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ব্যয় কমানো বা ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাস কৃষি ঋণে সুদের হার হ্রাস ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান।

প্রকৃত কৃষকের কাছে ভর্তুকি পৌঁছানোর ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা।

বীজ ও সার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানিমুখী প্রক্রিয়াজাত খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

শেষ কথা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক সংকট, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণনির্ভর বাজেট কাঠামো- এই তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। এমন বাস্তবতায় কৃষি ও উৎপাদন খাতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

বাজেট কেবল রাজস্ব আহরণের দলিল নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। যদি সেই দর্শনে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর স্পষ্ট কৌশল না থাকে, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সংখ্যাগতভাবে বাড়লেও তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছাবে না।

অতএব, সময় এসেছে বাজেট কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করে উৎপাদনমুখী, কৃষিবান্ধব এবং জনজীবনকেন্দ্রিক একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করার- যেখানে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নতিতেও প্রতিফলিত হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য বিশেষ অফার ঘোষণা করল ‘স্টাডি হরিজন’

ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য বিশেষ অফার ঘোষণা করল ‘স্টাডি হরিজন’

আগামী ৫ দিন দেশজুড়ে বাড়বে বৃষ্টি

আগামী ৫ দিন দেশজুড়ে বাড়বে বৃষ্টি

শিয়ালের কামড়ে আহত ৫

শিয়ালের কামড়ে আহত ৫

‘আমেরিকানদের একদম বিশ্বাস করেন না ইরানের জনগণ’

‘আমেরিকানদের একদম বিশ্বাস করেন না ইরানের জনগণ’

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App