কর্ণফুলীর তীরে কোরিয়ান উদ্যোক্তার স্বপ্নের সবুজ শিল্পনগরী ‘কেইপিজেড’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে একসময় ছিল কৃষিনির্ভর জনপদ। আজ সেই অঞ্চলই দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এখন শুধু শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্র নয়; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ।
প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত কিহাক সাংয়ের স্বপ্নের প্রকল্প কেইপিজেড বর্তমানে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আড়াই হাজার একরের শিল্পনগরী
১৯৯৯ সালে প্রায় ২ হাজার ৪৯২ একর জমির ওপর কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে ইয়ংওয়ান গ্রুপের বিনিয়োগে ৪৮টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। জুতা, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সুতা, ব্যাগসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এসব কারখানায়।
কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর গত ১৩ বছরে এই শিল্পাঞ্চল থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
সবুজ শিল্পায়নের অনন্য দৃষ্টান্ত
শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে কেইপিজেড। পুরো শিল্পাঞ্চলের ৫২ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ লাখের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিল্পকারখানার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে মোট এলাকার মাত্র ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ সংরক্ষিত রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলাধার ও জীববৈচিত্র্যের জন্য।
ইয়ংওয়ান গ্রুপ ইতোমধ্যে ১৭টি জলাধার নির্মাণ করেছে, যা বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) সবুজ শিল্পায়ন ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেইপিজেড নিজস্ব একটি টেকসই শিল্প মডেল গড়ে তুলেছে বলে মনে করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
১,৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদের বোটানিক্যাল গার্ডেন
কেইপিজেডে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে বর্তমানে প্রায় ১,৩০০ প্রজাতির বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, জলজ ও ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কেইপিজেড দেশের সবুজ শিল্পায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তিনি জানান, বোটানিক্যাল গার্ডেনটিতে ১৬টি পৃথক সেকশনে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা দুই হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে দুই লাখ দেশীয় গাছ রোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে চিকরাশি, গর্জন, গামার, চাপালিশ, লোহাকাঠ, সেগুন ও চম্পাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার
শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) ব্যবহার করছে কেইপিজেড। কারখানার তরল বর্জ্য পরিশোধনের পর পরিবেশসম্মত উপায়ে নিষ্কাশন করা হয়।
এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনঃব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রপ্তানি ও অর্থনীতিতে অবদান
কেইপিজেড ও ইয়ংওয়ান গ্রুপ বর্তমানে দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হয়।
রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই শিল্পাঞ্চল।
বর্তমানে ইয়ংওয়ানের নিজস্ব ৪৮টি কারখানার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান কেইপিজেডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পেলেন কিহাক সাং
৭৮ বছর বয়সী কিহাক সাং আশির দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। পরে ইয়ংওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা এবং কেইপিজেড গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশের শিল্প, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তাকে সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫ উপলক্ষে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশের ৬০ জনের বেশি বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারী কেইপিজেড পরিদর্শন করেন।
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ভারতের প্রতিনিধিরা শিল্পাঞ্চলের কারখানা, আইটি পার্ক, মেডিকেল সেন্টার, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প ও অন্যান্য অবকাঠামো ঘুরে দেখেন।
অনেক বিনিয়োগকারী কেইপিজেডের পরিবেশ, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের প্রশংসা করেন। তারা ভবিষ্যতে বিনিয়োগের আগ্রহও প্রকাশ করেন।
প্রশাসনিক জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কিহাক সাং বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ বাধা হলো প্রশাসনিক জটিলতা। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো লাভজনক বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য।
তার মতে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিশ্বাস করেন যে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং সেই কারণেই তিনি ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করে যাচ্ছেন।
সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভরতা
কেইপিজেডের অন্যতম বড় শক্তি এর নিজস্ব ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। বর্তমানে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শিল্পকারখানাগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে। অবশিষ্ট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
বিদ্যুৎ, বন্দর সুবিধা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করেছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সম্প্রসারণ
শিল্পায়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ করছে কেইপিজেড। ইতোমধ্যে একটি হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ চালু হয়েছে। পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণাধীন রয়েছে।
টেক্সটাইল খাতের দক্ষ জনবল তৈরির জন্য একটি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে। স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে।
৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান
বর্তমানে কেইপিজেডে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছেন, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কর্মপরিবেশ, ছুটির সুবিধা এবং নারী শ্রমিকবান্ধব নীতিমালার কারণে প্রতিষ্ঠানটি শ্রমবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
বদলে গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসন, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর এই অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হতে পারে।
কেইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কেইপিজেড একটি আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান আরও বাড়বে।
