জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিক, মৃত্যু বেড়ে ৯
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি ট্যাঙ্কার থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (সিএমসিএইচ), একজনের মরদেহ ন্যাশনাল হাসপাতালে এবং দুজনের মরদেহ ইয়ার্ডে রয়েছে। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইয়ার্ডে একটি জাহাজে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস লিকেজ থেকেই এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি জানানো হয়। শুক্রবার ছুটির দিন হলেও ফেরদৌস স্টিলে মোট ৩৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী কি ভারত সফরে যাচ্ছেন?
কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল সকাল ১১টা ১০ মিনিটের দিকে ইয়ার্ডে পৌঁছায়। সেখানে তারা দুজন শ্রমিককে মৃত এবং তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে আহত পাঁচ শ্রমিককে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া ইয়ার্ডে আরও দুটি মরদেহ পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলাউদ্দিন তালুকদার জানান, ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
এখন পর্যন্ত নিহত পাঁচজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন পলাশ দাস, সানি দাস, নাসির, হাবিব ও আরও একজন। দুপুর ১টার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা নিহতের সংখ্যা সাতজন বলে নিশ্চিত করেন। পরে সেই সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়ায়।
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, ইয়ার্ডের সেফটি টিম প্রথমে একটি ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস বের হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করে। পরে সেফটি টিমের কয়েকজন সদস্য লিকেজ পরীক্ষা করতে গেলে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এর আগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান জানিয়েছিলেন, তারা ১০ জন শ্রমিক আহত হওয়ার খবর পেয়েছেন। তখন একজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলেও অন্যদের সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি।
আরও পড়ুন: চলতি অর্থবছরেই ৫ স্থানীয় সরকার নির্বাচন: মীর শাহ আলম
দুর্ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা শ্রমিকদের ইয়ার্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা একপর্যায়ে ইয়ার্ডের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এ সময় কিছু ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে অংশ নেন এবং আহত আটজন শ্রমিককে উদ্ধারে সহায়তা করেন।
ইয়ার্ডে দুই শ্রমিকের মরদেহ আনার পর সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিহত পলাশ দাস ও সানি দাসের স্বজনরা কাছের জেলেপাড়া এলাকা থেকে ঘটনাস্থলে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুক্রবার কারখানা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শ্রমিকদের দিয়ে ইয়ার্ডে কাজ করানো হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সময় সেফটি টিমের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে তারা দাবি করেন।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু
তবে ফেরদৌস ওয়াহিদের বক্তব্য, দুর্ঘটনার আগেই ইয়ার্ডের সেফটি টিম ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস নির্গমনের বিষয়টি শনাক্ত করেছিল।
গ্যাস লিকের প্রকৃত কারণ এবং ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
শিল্প পুলিশ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামও সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ইয়ার্ডের বাইরে জড়ো হন।
সীতাকুণ্ডের এ দুর্ঘটনা দেশের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
