বাবার জেদ, মায়ের ত্যাগ: ১৩ মেয়ের ৮ জনই স্কুলের শিক্ষক
কামাল হোসেন, রামু (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
যে সময়ে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোই ছিল সামাজিক বাধার কারণ, সে সময়েই মেয়েদের পড়াশোনার স্বপ্ন দেখেছিলেন উলামিয়া। চার দশক পর সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়েছে। তাঁর ১৩ মেয়ের মধ্যে ৮ জনই এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবার সাহস আর মায়ের ত্যাগে গড়ে ওঠা এই পরিবার এখন পুরো এলাকার জন্য অনুপ্রেরণার নাম।
তার ১৬ জন সন্তানের মধ্যে প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্যিই বিরল। দুই স্ত্রীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সবাইকে একসাথে শিক্ষিত করে তোলা এটা পরিবারের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আর মা-বাবার ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চার দশক পর আজ সেই জেদ আর ত্যাগের ফসল ঘরে ঘরে। উলামিয়ার ১৩ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে ৮ মেয়েই এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছেলেরা সবাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বাবার অনুপ্রেরণা আর মায়ের ত্যাগকে পুঁজি করে ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া করে মেধা ও পরিশ্রমের জোরে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এই আট বোন।
আরও পড়ুন: ‘অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজন তরুণকে ক্ষমতায়ন করলেও বৃহত্তর অংশকে বাইরে রেখেছে’
উলামিয়ার বড় ছেলে রামু সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছলিম উল্লাহ বলেন, বাবা বলতেন শিক্ষাই সম্মান। তার দেখানো পথেই আজ আট বোন হাজারো শিশুর জীবন গড়ছে। তিনি আরও বলেন, বাবার মৃত্যুর পর নিজের আরও উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে পিতৃস্নেহে ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষিত করেছি।
জোয়ারিয়ানালা ইউপি চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন মো. প্রিন্সের মতে, উলামিয়ার এই ত্যাগের কারণে এলাকায় এখন মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। তার পরিবার পুরো উপজেলার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
রামু উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. হানিফ মিয়াও বলেন, একই পরিবারের আটজন শিক্ষক হওয়া সত্যিই বিরল। আমরা তাদের কাজে গর্বিত। এটা অন্য পরিবারগুলোর জন্যও উদাহরণ।
কক্সবাজারে নারী শিক্ষার পিছিয়ে থাকার প্রসঙ্গ টেনে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এবং রামুর কৃতি সন্তান মাফরুহা সুলতানা বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা না থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে এখানকার নারী শিক্ষা বরাবর পিছিয়ে। এমন বাস্তবতায় প্রচণ্ড সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে শ্রদ্ধেয় উলামিয়া তার কন্যা সন্তানদের সুশিক্ষিত করে শুধু অনন্য উদাহরণই সৃষ্টি করেননি, তিনি দেশ ও জাতি গঠনের একেকজন নির্মাতাও তৈরি করেছেন। এ কৃতিত্বের পেছনে রত্নগর্ভা উলামিয়ার স্ত্রীর অবদানও অনস্বীকার্য।
সত্তরের দশকে প্রতিকূল আবহাওয়ায় সযত্নে রোপণ করা সেই ছোট স্বপ্নটি আজ শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। আজ তার নাতি-নাতনিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস ক্যাডার, ডাক্তার ও অ্যাপলের একজন প্রকৌশলী।
