সাইকেলের পেছনে খবরের বোঝা, শাহ আলমের ৩৫ বছরের ছুটে চলা
বাদল আহাম্মদ খান, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বের হন মো. শাহ আলম। গন্তব্য আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন। সেখানে পৌঁছে সংগ্রহ করেন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা। পত্রিকাগুলো গুছিয়ে সাইকেলের পেছনে সীটের সাথে বাঁধেন। এরপর শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের ছুটে চলা। সাইকেল চালিয়ে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস, স্কুল-কলেজে গিয়ে পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি।
প্রতিদিন প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে আখাউড়া উপজেলার কিছু এলাকাসহ বিজয়নগর উপজেলার কিছু অংশে পত্রিকা বিক্রি করেন পঞ্চাশোর্ধ হকার শাহ আলম। দৈনিক ১০/১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন তিনি। রোদ-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া যা-ই হোক শাহ আলমের যেন বিশ্রাম নেই। কঠোর পরিশ্রমী শাহআলম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার পার্শবর্তী বিজয়নগর উপজেলার মেরাশানি গ্রামের বাসিন্দা। বিগত ৩৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির পেশায় জড়িত তিনি। পত্রিকা বিক্রির কমিশন দিয়ে চলে তার সাত সদস্যের সংসার।
আজমপুর স্টেশনে কথা হয় শাহ আলমের সাথে। পত্রিকা ভাঁজ করার ফাঁকে কথা বলেন তিনি। শাহআলম বলেন, সকাল ৯টার আগে আজমপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেন তিনি। পারাবাত ট্রেনে ঢাকা থেকে পত্রিকা আসে। ট্রেন থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে আখাউড়া পৌরশহরের সড়ক বাজার, উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তর, লালবাজার, বড়বাজার ঘুরে আখাউড়া-চান্দুরা সড়ক ধরে খড়মপুর, দুর্গাপুর, আজমপুর হয়ে বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল, বিষ্ণুপুর হয়ে মেরাশানি বাজার পর্যন্ত পত্রিকা বিলি করেন তিনি। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা ৬/৭টা বেজে যায়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাঠকের কাছে পত্রিকা নিয়ে যান তিনি।
আরও পড়ুন: সার না পেয়ে গুদামের দরজা ভেঙে ১০ হাজার কেজি সার নিয়ে গেল কৃষক
শাহ আলমের ভাষ্য, এখন মানুষের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। পত্রিকার চাহিদাও কমে গেছে। দৈনিক ২০০ কপির মত পত্রিকা বিক্রি হয়। পত্রিকার কমিশন থেকে ৪০০ টাকার মতো আয় হয়। তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ঝড় বৃষ্টির দিনে পত্রিকা বিক্রি করা খুব সমস্যা হয় বলে জানান শাহ আলম। তিনি বলেন, ঝড় বৃষ্টির দিনে রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকে সাইকেল চালাতে খুব অসুবিধা হয়। তখন সময়ও বেশি লাগে। সাবধানে সাইকেল চালাতে হয়। পলিথিন দিয়ে পত্রিকা ঢেকে রাখতে হয়। এছাড়াও কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা ভাঙা। সাইকেল চালাতে তখন খুব কষ্ট হয়।
পত্রিকা বিক্রির পেশায় আসার বিষয়ে শাহআলম বলেন, ১৯৯১ সালে হরষপুর রেলওয়ে স্টেশনের আক্তার বুক স্টল থেকে এলাকার এক লোকের জন্য পত্রিকা এনে দিতাম। তাঁর পরামর্শেই পত্রিকা বিক্রি শুরু করি। প্রথমে কয়েক বছর নিজ এলাকায় পত্রিকা বিক্রি করতাম। পরে আখাউড়া রেলওয়ে ষ্টেশনে এসে অবসর রেলওয়ে বুকস্টল থেকে পত্রিকা নিয়ে বিক্রি করা শুরু করি। তখন পত্রিকার অনেক চাহিদা ছিল। আখাউড়ায় বুক স্টলসহ ১৪-১৫ জন হকার ছিল। তখন আয়ও বেশি ছিল। ধীরে ধীরে পত্রিকার চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্য হকাররা এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আমি শুধু আছি। জানি না আর কত দিন থাকতে পারবো।
পত্রিকা বিক্রির কমিশন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে জানিয়ে শাহ আলম বলেন, সারাদিন ১০-১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করে ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। কিছু মানুষের সহযোগিতা আর আল্লাহর রহমতে টিকে আছি। তাঁর কাছে পত্রিকা বিক্রি শুধু পেশা নয়, ৩৫ বছরের অভ্যাস, জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ভালোবাসা।
