মন্ত্রীদের সফরে আলোচনায় সিংগাইর, অপূর্ণ উন্নয়নে দীর্ঘশ্বাস!
মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
ফাইল ছবি
রাজধানীর অতি সন্নিকটে অবস্থান করেও উন্নয়নের দৌড়ে বারবার পিছিয়ে পড়ছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা। প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ১২৫ জন মানুষের বসবাসের এই উপজেলায় রয়েছে ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ এ জনপদে গত চার মাসে প্রধানমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রীর আকস্মিক সফরে সিংগাইর জাতীয়ভাবে আলোচনায় এলেও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন দাবিগুলোর বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
চলতি বছরের ১১ মার্চ কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রটোকল ছাড়াই গাড়ির জাতীয় পতাকা ঢেকে ছদ্মবেশে সিংগাইর উপজেলা পরিষদে আকস্মিক পরিদর্শনে আসেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জে. মো. আব্দুল বারী, এমপি। তিনি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও সেবার মান পর্যবেক্ষণ করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
এর মাত্র তিন দিন পর গত ১৪ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে কয়েকজন চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
গত ২১ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উপজেলার জয়মন্টপ ও সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করে নকলমুক্ত ও সুশৃঙ্খল পরীক্ষা পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সবশেষে গত ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিংগাইরের জামির্ত্তা ইউনিয়নের ভিন্নাডাঙ্গী-সুদক্ষিরা কালাবাগার চক এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন। তিনি সেনাসদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়, মহড়া পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
তবে প্রতিটি সফরের পরই স্থানীয়দের মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—সিংগাইরের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন দাবিগুলোর বাস্তবায়ন কবে হবে?
স্থানীয়দের মতে, উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা। রাজধানীর সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করলেও সংকীর্ণ সড়কটি এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে, নষ্ট হচ্ছে মানুষের মূল্যবান সময় ও অর্থ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এবং মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খান রিতা সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও (ডেমি-অফিসিয়াল) লেটার পাঠিয়েছেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন পেলে সিংগাইরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
এলাকাবাসীর আরেকটি দীর্ঘদিনের দাবি সিংগাইরে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা। গ্যাস না থাকায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না, ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হলে হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে পাটুরিয়া রেললাইন সিংগাইরের ওপর দিয়ে বাস্তবায়নের দাবিও দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু সিংগাইর নয়, পুরো মানিকগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। উপজেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সিংগাইর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার দাবি দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবিও বারবার উঠে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা ঢাকায় কিংবা সাভারে অবস্থান করে সিংগাইরে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে সাধারণ মানুষ সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। আকস্মিক পরিদর্শনে বিষয়টি ধরা পড়লেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আমার বাবাসহ অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। নতুন সরকারের উচিত দ্রুত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা।” জামির্ত্তা ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আবু সায়েম বলেন, “চার লেন সড়ক, গ্যাস সংযোগ ও শিল্পায়নের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো সংশ্লিষ্টদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।”
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কবি ও সাহিত্যিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বারবার সফর নিঃসন্দেহে সিংগাইরের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। রাজধানীর এত কাছে অবস্থান করেও সিংগাইর দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে অবহেলিত। এখন প্রয়োজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে সড়ক, গ্যাস, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানসহ জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা। আমরা আশাবাদী, আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হলে সম্ভাবনাময় এই জনপদও দেশের উন্নয়নের মূলধারায় স্থান করে নেবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, “আমরা তো মন্ত্রীদের কোন প্রোগ্রাম করে আনিনি। তারা যখন আসেন জনগণের যে প্রত্যাশা থাকে সেটা বলার সুযোগ থাকে না। মন্ত্রীরা এসেছিলেন তাদের স্পেসিফিক কাজে।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বারবার আগমন নিঃসন্দেহে সিংগাইরের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে এসব সফর যদি কেবল সরকারি কার্যক্রম পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাবে। তাদের দাবি, রাজধানীর পাশের সম্ভাবনাময় এই উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের স্বার্থে চার লেন মহাসড়ক, গ্যাস সংযোগ, শিল্পায়ন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
