পুলিশের সোর্স থেকে মাদক কারবারে, পিচ্চি রাজার উত্থান যেভাবে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে ১৯৯৯ সালে জন্ম রাজার। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সেখানেই। ক্যাম্পের এ ব্লকের ১৭৭ নম্বর বাসায় থাকতেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ‘পিচ্চি রাজা’ নামে পরিচিতি পান।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে কিশোর বয়সে জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়েন রাজা। একই সময়ে ক্যাম্পের পরিবেশ ও বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ শুরু করেন তিনি। পরে রাজধানীর একটি গ্যাস পাম্পে কিছুদিন চাকরি করেন। একটি ঘটনায় চাকরি হারানোর পর আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হন রাজা। তার বিরুদ্ধে ৫১টি ইয়াবা উদ্ধারের মামলা হয়। এটিই তার বিরুদ্ধে করা প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদক কারবার আরও বিস্তৃত করেন তিনি।
২০২০ সালে কোভিডে ইশতিয়াকের মৃত্যু হলে ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ রাজার হাতে আসে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে জেনেভা ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে রাজার বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, এলাকার লাইনম্যান নিয়োগ ও অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে সময় পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। সেখান থেকেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ফ্ল্যাট, প্লটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রাজা একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই বাহিনীর সদস্যরা মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
২৭ বছর বয়সী রাজার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই ২৫টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক ও ১৩টি মাদকের মামলা।
প্রিজন ভ্যান থেকে পলায়ন
গত ১৯ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে ছিলেন রাজা। ২৭ সেপ্টেম্বর একটি মামলায় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে তাকে ঢাকার একটি আদালতে নেওয়া হয়। আদালতে হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রাজাকে আদালতে নেওয়া এসআই প্রবীর কুমার, প্রিজনভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনসহ পুলিশের পাঁচ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
পুলিশ জানায়, সেদিন তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছাকাছি একটি প্রাইভেটকার আগে থেকেই অবস্থান করছিল। গাড়িটিতে ছিলেন পিচ্চি রাজার বোন এবং বোরকা পরা আরেক নারী। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই গাড়িতে রাজাকে তুলে দেন এসআই প্রবীর কুমার।
পুলিশের দাবি, প্রাইভেটকারটি রাজাকে নিয়ে ওই স্থান থেকে চলে যাওয়ার পর বিকল্প একটি বাহনে করে গাজীপুর মহানগরীর বাইমাইল এলাকায় গিয়ে প্রিজন ভ্যানে ওঠেন এসআই প্রবীর। একই দিন পিচ্চি রাজার বোনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে ১৩ বার কথা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
রাজার পলায়নের ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তারের পর আদালত তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। বৃহস্পতিবার থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হওয়ার কথা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সৈয়দ মো. মিজানুর ইসলাম বলেন, পিচ্চি রাজাকে পালাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না এবং হলে কত টাকা লেনদেন হয়েছে, তা জানতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের পরই পলায়নের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, তল্লাশি চালিয়ে প্রিজন ভ্যানচালক কামালের বাসা থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
