দেশ গঠনে প্রতিটি প্রবাসীকে ‘অ্যাম্বাসেডর’ হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের উন্নয়ন, সংস্কার ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিদেশের মাটিতে বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশিই দেশের একেকজন প্রতিনিধি বা ‘অ্যাম্বাসেডর’। প্রবাসীরা জাপানি ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে জাপানের টোকিওতে হোটেল নিউ ওতানির হলরুমে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন জাপান এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সভায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে নানা প্রশ্ন করেন। জবাবে তারেক রহমান জাপানি ভাষা শিক্ষা, শিশুদের বিকাশ, স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানি ব্যবসায়ীদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে, যাতে দ্রুত বিনিয়োগ আনা সম্ভব হয়।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, এ বিনিয়োগের ফলে চারটি বড় সুফল পাওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো—দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং খেটে খাওয়া ও প্রান্তিক মানুষের উপকারে আসে—এমন সংস্কারই এখন সবচেয়ে জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়তে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। এর অংশ হিসেবে নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক সচেতনতাবিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সেবাপ্রাপ্তির জটিলতা কমানোই প্রকৃত সংস্কার।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, শহর ও গ্রামজুড়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বায়ুদূষণ কমাতে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে দেশে পানির স্তর কমছে। ভবিষ্যতে পানির সংকট এড়াতে শহীদ জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির আদলে খাল পুনঃখনন ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তরুণদের বেকারত্ব কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, পাঁচ শতাধিক বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি বড় রাষ্ট্রীয় কারখানা চালুর প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের সব মত ও পথের মানুষকে রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি শিশু যেন ভালো শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ বাতাস পায়—এ লক্ষ্য নিয়ে সবাই একমত হতে পারেন।
একটি গণতান্ত্রিক, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রবাসী ও দেশবাসীর সহযোগিতা এবং দোয়া কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, যেসব সংস্কারের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে না দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।
প্রবাসী ও অনলাইনে বক্তব্য শোনা দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তাঁরা ও তাঁদের সন্তানরা উপকৃত হবেন। তাই সরকারের কাজগুলো সঠিক মনে হলে সেগুলোকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় উপস্থিত প্রবাসীরা করতালি দিয়ে তাঁর বক্তব্যে সাড়া দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে জাপানে যাওয়া আম জনতা পার্টির সদস্যসচিব মো. তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা মন্তব্য দেখা গেছে। তাঁর অবদান নেই কিংবা তাঁকে সফরে নিয়ে গিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অন্যান্য সমস্যা নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ূন কবির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জাপান বিএনপির সভাপতি রেজা মীর, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মনি, সহসভাপতি মাসুম জাকির, ব্যবসায়ী নেতা কাজী সারওয়ার হাবিব ও দপ্তর সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়াসহ প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সভা শেষে জাপান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানকে আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
