রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১১:২২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতজনিত বৈদেশিক চাপকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ এবং ব্যাংকিং খাতের ব্যাপক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে আইএমএফ। একই সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার, অর্থায়নের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আগামী কয়েক মাসে বিস্তারিত আলোচনা চলবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সরকারের অনুরোধে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে। সফরকালে তারা দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
আইএমএফের কর্মকর্তা আইভো ক্রজনারের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এ তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, সংস্কার অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ কর্মসূচির পরিধি, ঋণের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আগামী কয়েক মাস আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এসব ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বেড়েছে। পাশাপাশি ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সংস্থাটি আরো জানায়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক খাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। যদিও প্রবাসী আয় সন্তোষজনক হারে বাড়ছে, তবুও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বহিঃখাতের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, এবারের আলোচনা ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ প্রতিবেদনে উল্লেখিত নীতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় টেকসইভাবে বাড়াতে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থা যৌক্তিক করা জরুরি। পাশাপাশি রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিবৃতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিময় হার আরও নমনীয় করা এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে সংস্থাটি বলেছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাতটির বিদ্যমান দুর্বলতা সুশৃঙ্খলভাবে দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির কর্মীদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে ২০২৭ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক সক্ষমতা জোরদার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে।
আইএমএফের মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব সংকট এবং বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি একে অপরকে আরো তীব্র করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নিম্নমুখী ঝুঁকি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে বেশি।
সফর শেষে বাংলাদেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা, আতিথেয়তা এবং খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
