নতুন প্রত্যাশার আলোকে এগিয়ে যাচ্ছে মাউশি: ডিজি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
গত ছয় মাসে শিক্ষাখাতে ঘটেছে নানা ঘটনা। তবুও দেশের মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। তবে দেশের মানুষের স্বপ্ন ও নতুন প্রত্যাশার আলোকে এগিয়ে যাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেন মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল— মাউশিকে আরও গতিশীল, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জনবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এ লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বিভিন্ন উইংয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যথাসম্ভব নিচের পর্যায়ে অর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিষ্পত্তিযোগ্য অনেক বিষয় পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ে দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সেবাপ্রদানের গতি বেড়েছে।
প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দীর্ঘদিনের একটি বড় ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ হিসেবে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ১৮টি প্রকল্পের ধারণাপত্র প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ রিসোর্সপুল গঠন, পত্র গ্রহণ শাখার ডিজিটালাইজেশন, ইএমআইএস আধুনিকায়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবকিছু একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তবে আমার প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা— সেই ভিত্তি তৈরির কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে এসব উদ্যোগকে টেকসই ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।
সরকারের ছয় মাসে চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষাখাতের সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, একাধিক চ্যালেঞ্জ ছিল। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, তথ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম— এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে হয়েছে। বিশেষ করে পত্র গ্রহণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় যথাসময়ে চিঠি সংশ্লিষ্ট উইংয়ে না পৌঁছানো, তদন্ত প্রতিবেদন হারিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ কারণে পত্র গ্রহণ শাখাকে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইএমআইএস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও মাঠপর্যায়ে অসন্তোষের বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে। তাই পেনিট্রেশন টেস্টিং, সিকিউরিটি অডিট এবং ক্লাউড মাইগ্রেশনের মাধ্যমে ইএমআইএস আপগ্রেডেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম ও সার্বিক পরিবেশ যথাযথভাবে মনিটর করা। এ জন্য কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা এবং এর পূর্ববর্তী পর্যায়ে ডিএমএস অ্যাপের মাধ্যমে লাইভ মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যাগুলো শুধু চিহ্নিত করাই নয়, সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের পথও আমরা তৈরি করছি।
শিক্ষাখাত সংস্কারের বিষয়ে প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে সেন্ট্রাল সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা' চালুর উদ্যোগ গ্রহণ 'সেন্ট্রাল সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা' চালু না হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম (ডিএমএস) অ্যাপ এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে লাইভ মনিটরিং চালু হবে।
সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতে উদ্যোগ এবং অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীদের বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করার শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা প্রদান করে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২১টি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস (আনন্দময় শিক্ষা), বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যে অগ্রাধিকার, শিক্ষাখাতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য নিরসণ, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস’ প্রদান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা উন্নয়ন, মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য "ডিজিটাল লার্নিং সিস্টেম" এবং”লার্ণ ম্যাথ উইথ খান একাডেমি” প্রকল্প চালু করা হয়েছে। পৃথক শিক্ষা চ্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ শিক্ষা খাতে এমন কী ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবে, যা তারা সরাসরি অনুভব করতে পারবে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, 'সেন্ট্রাল সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা' চালুর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে মানসম্পন্ন পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ যথাসময়ে ইএফটির মাধ্যমে প্রেরণ করা হবে। "স্টার্টাপ সাইন্স প্রোজেক্ট এন্ড ইনোভেশন আইডিয়া সোকেসিং”-প্রোগ্রাম চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের হয়ে গঠনমূলক সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। “প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ড কাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা” এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত রাখায় তারা নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। “ডিজিটাল লার্নিং সিস্টেম” এবং “লার্ন ম্যাথ উইথ খান একাডেমি” প্রকল্প চালুর মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষাখাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধে পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষাখাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধে আমাদের অন্যতম প্রধান কৌশল হচ্ছে প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। পত্রগ্রহণ শাখায় অনিয়ম ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা দূর করতে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইএমআইএস আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করার উদ্যোগ রয়েছে। শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে, যাতে মানবিক হস্তক্ষেপ কমে এবং প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হয়।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে গত ১৭ বছরে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পুনর্বহাল ও বকেয়া প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং এবং ডিএমএসের মাধ্যমে লাইভ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের মনিটরিং ও সুপারভিশনের দুর্বলতা কমানো সম্ভব হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে অনিয়ম করার সুযোগই ক্রমান্বয়ে কমে আসে।
শিক্ষাখাতে ছয় মাসে সফলতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, আমি মনে করি, এই সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো— শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যাকে চিহ্নিত করে একসঙ্গে বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের কাজ শুরু করা।
মাউশিকে সেন্টার অব এক্সিলেন্সেস হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ, ১৮টি প্রকল্পের ধারণাপত্র দ্রুত প্রস্তুত ও প্রেরণ, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে বিশেষজ্ঞ রিসোর্সপুল, পত্র গ্রহণ শাখার ডিজিটালাইজেশন, ইএমআইএস, আপগ্রেডেশন, কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় শিক্ষক বদলি, এমপিও-সংক্রান্ত ডায়নামিক সফটওয়্যার, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী কার্যক্রম এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বৈষম্য কমানোর জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাব—এসবই আমাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আমরা এটিকে চূড়ান্ত সফলতা হিসেবে দেখছি না। বরং এটি একটি শক্তিশালী সূচনা। আগামী দিনের পরিকল্পনা হচ্ছে— মাউশির সেবাকে আরও ডিজিটাল ও জনবান্ধব করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনিটরিং শক্তিশালী করা, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধি করা, সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো এবং শিক্ষায় একটি আনন্দময়, নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবেশ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকেও মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা হবে। স্কুল নিউট্রিশন প্রোগ্রাম, হেলথ প্রমোটিং স্কুল এবং গ্রিন স্কুলের মতো উদ্যোগগুলোও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
আমাদের অঙ্গীকার হলো— শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলনির্ভর না রেখে দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজগতের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
