বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি এত জনপ্রিয় কেন?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আকাশ মেঘে ঢেকে গেলে, টুপটাপ বৃষ্টি নামলেই অনেকের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি। সহজে রান্না করা যায়, পেট ভরে এবং স্বাদেও অতুলনীয় এই তিন কারণেই বর্ষার দিনে খিচুড়ির জনপ্রিয়তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অটুট রয়েছে। তবে এই খাবারের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো, তার পেছনে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাস্তব জীবনের নানা গল্প।
ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলা অঞ্চলে খিচুড়ির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গ্রন্থ মনসামঙ্গল কাব্যেও খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে দেবাদিদেব শিবের পছন্দের খাবারের তালিকায় খিচুড়ির কথা উঠে এসেছে। বর্তমানে অনেকেই খিচুড়িকে সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবে দেখলেও একসময় ডাল ছিল বেশ মূল্যবান খাদ্যসামগ্রী এবং অভিজাত পরিবারগুলোর খাদ্যতালিকায় এর বিশেষ স্থান ছিল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও খিচুড়ি ছিল জনপ্রিয় একটি পদ।
খিচুড়ির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বাউল ও ভ্রাম্যমাণ সাধকেরা গান গেয়ে পারিশ্রমিক হিসেবে চাল ও ডাল সংগ্রহ করতেন। পরে সহজ ও দ্রুত খাবার তৈরির জন্য এই দুই উপকরণ একসঙ্গে রান্না করতেন। ধীরে ধীরে সেই খাবারই খিচুড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু বাংলাতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলেও চাল ও ডালের মিশ্রণে তৈরি এই খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিক সেনাপতি সেলুকাস ভারতীয় উপমহাদেশে এমন একটি খাবারের বর্ণনা দিয়েছেন। পণ্ডিত আল-বিরুনিও তাঁর লেখায় এর কথা উল্লেখ করেছেন। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা ভারত সফরের সময় মুগ ডাল দিয়ে তৈরি খিচুড়ির বর্ণনা দেন। এছাড়া চাণক্যের রচনাতেও মৌর্য যুগে অনুরূপ খাবারের উল্লেখ রয়েছে।
মুঘল আমলেও খিচুড়ির জনপ্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। সম্রাট আকবরের দরবারের ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আইন-ই-আকবরী-তে বিভিন্ন ধরনের খিচুড়ির বর্ণনা দিয়েছেন। জানা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য বিশেষভাবে পেস্তা ও কিসমিস দিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের খিচুড়ি, যার নাম ছিল ‘লাজিজান’। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের মাধ্যমে এই খাবার ইউরোপ, বিশেষ করে ইংল্যান্ডেও পরিচিতি লাভ করে।
বর্ষাকালে খিচুড়ি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে বাস্তব জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অতীতে গ্রামবাংলায় টানা বৃষ্টিতে চারপাশ জলাবদ্ধ হয়ে পড়ত। কাদামাটি ও পানিতে বাজারে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় ঘরে মজুত থাকা চাল ও ডাল দিয়েই সহজে রান্না করা হতো খিচুড়ি।
আরেকটি কারণ ছিল রান্নার সুবিধা। বর্ষার দিনে ভেজা পরিবেশে বারবার উনুনে আগুন জ্বালানো সহজ ছিল না। তাই একবারেই চাল ও ডাল একসঙ্গে রান্না করে একটি পূর্ণাঙ্গ খাবার তৈরি করা হতো। সময়ের সঙ্গে সেই খিচুড়ির সঙ্গে যোগ হয়েছে ডিম, মাছ, মাংস, গরুর মাংস, খাসির মাংস, বিভিন্ন সবজি ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া, যা এর স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
খাদ্যাভ্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেকের মতে বর্ষায় খিচুড়ি খাওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। খিচুড়ি তুলনামূলকভাবে ভারী খাবার হলেও ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। বিশেষ করে গরম গরম খিচুড়ির সঙ্গে ভাজা বা ভর্তা খাওয়ার স্বাদ বর্ষার দিনে আলাদা মাত্রা যোগ করে। একই কারণে শীতকালেও খিচুড়ির জনপ্রিয়তা কমে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, খিচুড়ির সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক কেবল স্বাদের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, বাংলার সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং আবহাওয়ার বাস্তবতা। তাই আজও আকাশে কালো মেঘ জমলেই অনেকের মনে প্রথম যে খাবারের কথা আসে, তা হলো ধোঁয়া ওঠা এক প্লেট গরম খিচুড়ি।
