ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ না জেতার পেছনে ৩ কারণ
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ শুরু হলো, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় দল ব্রাজিলের শুরুটা হলো না প্রত্যাশামতো। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র স্কোরলাইন হিসেবে বিপর্যয় নয়, তবে পারফরম্যান্স হিসেবে যথেষ্ট সতর্কবার্তা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একক নৈপুণ্য ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খেলায় সেই ভয় ধরানো ছাপ দেখা যায়নি।
কেন জয় পেল না ব্রাজিল? ম্যাচের ভেতর থেকে তিনটি কারণ সবচেয়ে স্পষ্ট।
১. উদ্বেগে ছন্নছাড়া শুরু
কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে নিজেই বলেছেন, ব্রাজিল শুরুটা ভালো করেনি। সেটি মাঠেও স্পষ্ট ছিল। প্রথম ২০ মিনিটে ব্রাজিলকে ব্রাজিলের মতো লাগেনি। বল পায়ে স্থিরতা ছিল না, চাপ সামলানোর প্রস্তুতি ছিল না, মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ওঠার পথও পরিষ্কার ছিল না।
মরক্কো শুরু থেকেই সাহসী ফুটবল খেলেছে। তারা রক্ষণে বসে ছিল না; বরং ব্রাজিলের মাঝমাঠে চাপ দিয়েছে, বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত সামনে উঠেছে। সেই চাপেই ব্রাজিল বারবার বল হারিয়েছে। কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারায়েস ও লুকাস পাকেতারা খেলাটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।
২১ মিনিটে মরক্কোর গোলটি হঠাৎ পাওয়া সুযোগ ছিল না। ব্রাহিম দিয়াসের দারুণ পাস আর ইসমাইল সাইবারির ঠান্ডা মাথার ফিনিশ ছিল মরক্কোর আত্মবিশ্বাসী শুরুর পুরস্কার। ব্রাজিল তখনো ম্যাচের ছন্দ খুঁজছিল।
২. মাঝমাঠ ও ডান পাশের ভারসাম্যহীনতা
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাঝমাঠে। কাসেমিরো অভিজ্ঞ, কিন্তু মরক্কোর দ্রুত ও তরুণ মাঝমাঠের বিপক্ষে তিনি কাজ করতে পারেননি। ব্রুনো গিমারায়েসও নিজের স্বাভাবিক প্রভাব রাখতে পারেননি। পাকেতা মাঝে মাঝে ঝলক দেখালেও ধারাবাহিকভাবে খেলা গড়তে পারেননি।
এর সঙ্গে ডান পাশের সমস্যাও যোগ হয়। রজার ইবানিয়েজ মূলত সেন্টারব্যাক। তাঁকে রাইটব্যাক হিসেবে খেলানোর ঝুঁকি প্রথমার্ধেই ধরা পড়ে। মরক্কো বারবার ব্রাহিম দিয়াস, আশরাফ হাকিমি ও এল খানুসদের মাধ্যমে সেই পাশে চাপ তৈরি করেছে।
আনচেলত্তি বিরতিতেই বুঝে যান, কিছু বদলানো দরকার। ইবানিয়েজ ও কাসেমিরোকে তুলে দানিলো ও ফাবিনিয়োকে নামানো ছিল শুধু কৌশলগত পরিবর্তন নয়, প্রথমার্ধের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তিও। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল কিছুটা স্থিরতা পেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিতে পারেনি।
৩. আক্রমণে দলগত ছন্দ নয়, ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত ঝলক
ব্রাজিলের গোলটি ছিল অসাধারণ। কিন্তু সেটি দলগত আক্রমণের ফল ছিল না, ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। ৩২ মিনিটে বাঁ দিক থেকে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে তাঁর জোরালো শট ব্রাজিলকে সমতায় ফেরায়। এই গোল না হলে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য আরও কঠিন হয়ে যেতে পারত।
সমস্যা হলো, ভিনিসিয়ুস ছাড়া ব্রাজিলের আক্রমণে ধার কম ছিল। রাফিনিয়া প্রচুর পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু শেষ পাস বা ফিনিশিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারেননি। ইগর থিয়াগো চমক হিসেবে একাদশে ছিলেন, কিন্তু খুব কম বল পেয়েছেন। যে সুযোগ পেয়েছেন, সেটিও কাজে লাগাতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধে মাতেউস কুনিয়া ও লুইজ হেনরিক নামার পর ব্রাজিল আক্রমণে কিছুটা গতি বাড়ায়। কিন্তু মরক্কোর রক্ষণ ভাঙার মতো পরিষ্কার পরিকল্পনা দেখা যায়নি। শেষ দিকে কর্নার, ক্রস ও কিছু চাপ থাকলেও ইয়াসিন বোনোকে নিয়মিত পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি ব্রাজিল।
সতর্কবার্তা, বিপর্যয় নয়
প্রথম ম্যাচে ড্র মানেই বিশ্বকাপ শেষ নয়। আনচেলত্তির কথাই ঠিক, প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। কিন্তু প্রথম ম্যাচ অনেক সময় বলে দেয়, কোন জায়গায় সমস্যা আছে। মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিল সেই সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবেই দেখল।
উদ্বেগ কাটাতে হবে, মাঝমাঠে ভারসাম্য আনতে হবে, ডান পাশের সমাধান খুঁজতে হবে এবং আক্রমণে শুধু ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত জাদুর ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
ব্রাজিলের সামনে এখন হাইতি। কাগজে-কলমে সহজ ম্যাচ, কিন্তু এই বিশ্বকাপের শুরুই দেখিয়ে দিয়েছে, নামের জোরে ম্যাচ জেতা যায় না। ব্রাজিলকে এখন খেলাতেও ব্রাজিল হতে হবে।
