গোলাম পরওয়ার
সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয়নি, হবেও না
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১০:২৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা যাবে না।
রোববার (১৪ জুন) সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির উদ্যোগে আয়োজিত "তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ" শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয়নি, হবেও না। এজন্য কেবল তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার করতে হবে। জুলাই আন্দোলনে জাতি পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের পক্ষে রাজপথে নেমে আন্দোলন-সংগ্রাম করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে বিদায় করেছে। জাতির প্রত্যাশা ছিল, নতুন বাংলাদেশ জুলাইয়ের চেতনায় বিনির্মাণ হবে। কিন্তু বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই চেতনা উপেক্ষা করছে। বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও নির্বাচনের পর এখন তারা জুলাই সনদ মানে না, গণভোটের রায় মানে না এবং সংস্কার চায় না।
বর্ষীয়ান, মজলুম সাংবাদিক ও প্রখ্যাত লেখক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফা ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা। কিন্তু ক্ষমতায় বসে বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। সরকার জাতির সঙ্গে দ্বিচারিতা করছে। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানবে বলে জনগণের সঙ্গে নতুন প্রতারণা করছে। যদি জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালনই করে, তবে গণভোটের গণরায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে অনীহা কেন? -জাতি সবই বুঝে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করে জনগণের প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সেমিনারে সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির পরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সরকার সংস্কার শব্দটি এখন আর উচ্চারণই করে না। অথচ তাদের ৩১ দফায় ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের কথা। কিন্তু এখন তারা সরকার গঠনের পর সংস্কারের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্র সংস্কার হলে তারা দলীয়করণ করতে পারবে না। দলীয়করণ করতে না পারলে দুর্নীতি, লুটপাট, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির সুযোগ পাবে না। এজন্যই সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারসহ পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার না হলে আজকে যে বিএনপি সংস্কারের বিপক্ষে, আগামীতে তারাই সংস্কারের জন্য আক্ষেপ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে সাংবাদিক আবুল আসাদ বলেন, গণমাধ্যমের ওপর মানুষ আজ সন্তুষ্ট নয়। কারণ গণমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের দেশে কোনো সময়, কোনো কালেই গণমাধ্যম স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তিনি নিজের সাংবাদিকতার ৫৪ বছরের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ৫৪ বছরের সাংবাদিকতায় তিনি ৫৪ মাসও নিজের পুরো বেতন-সম্মানী পাননি। সাংবাদিকেরা মালিক কর্তৃক শোষিত হওয়ার কারণে অনেক সময় অনেক সাংবাদিক অপেশাদারিত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার অনিবার্য।
সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির পরিচালক জাহিদুর রহমানের পরিচালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. খাদিমুল ইসলাম। এতে অন্যান্যের মধ্যে একুশে টিভির হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ, গ্রীন ওয়াচ বিডির সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক ডিজি মো. সালাহ উদ্দিন, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিক রুম্মান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
একুশে টিভির হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ বলেন, শুধু ক্ষমতায় থাকলেই ক্ষমতাবান হওয়া যায় না। ডিপ স্টেট নামক যে ক্ষমতাবানরা আছে, তারাও পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তারা ক্ষমতাসীনদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান। তিনি বলেন, কোনো সরকারের সময়েই শতভাগ স্বাধীন সাংবাদিকতা দেখা যায়নি। কেউ গণমাধ্যম বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে, কেউ কম নিয়ন্ত্রণ করেছে। তিনি আরও বলেন, সরকার এবং রাষ্ট্র দুটি আলাদা বিষয়। সরকারের বিরোধিতা করা মানে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়। তাই সরকারের উচিত স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা।
গ্রীন ওয়াচ বিডির সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, সাংবাদিকদের কম বেতনের কারণে অনেকে মূলধারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সব সরকারই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশেও একই ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী আজও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরে আসেনি।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতে ইসলামী পরিচালনা করছে বলে গুজব ও মিথ্যাচার করা হয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাসস, পিআইবি-সহ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন স্তরে যাদের ডিজি নিয়োগ করেছিল, তাদের অনেকেই ফ্যাসিস্টদের দোসর। আবার অনেকেই কখনো সাংবাদিকতাই করেননি, তাদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কার করা যায়নি। বিগত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের জীবন ও রক্ত দিতে হয়েছে। বিনা বিচারে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে সেই ফ্যাসিবাদের ছায়া চলতে দেওয়া যায় না।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কারের জন্য দুটি বিষয় চূড়ান্ত করতে হবে। একটি হচ্ছে গণমাধ্যমের মালিক কারা হবেন, আরেকটি হচ্ছে সাংবাদিক কারা হবেন। কারণ গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছেন দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা শ্রেণির লোকজন। দুর্নীতি ও লুটের সম্পদ রক্ষা করতে সাংবাদিকদের মালিকের পক্ষে ভূমিকা রাখতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন দেওয়া হয়, যে বেতনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সাংবাদিক অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেন। তাই তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারের জন্য গণমাধ্যমের মালিক ও সাংবাদিকদের মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।
