ফকল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত ব্যানার যেভাবে পৌঁছাল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের হাতে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জয় নিশ্চিত করার পর বিতর্কের জন্ম দেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে উদ্যাপনের সময় খেলোয়াড়দের হাতে দেখা যায় মালভিনাস (ফকল্যান্ড) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবিসংবলিত একটি ব্যানার। স্টেডিয়ামের ভেতরে নিষিদ্ধ এই রাজনৈতিক বার্তা কীভাবে মাঠে পৌঁছাল, তা নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এক সমর্থক হোটেলের বিছানার চাদরে ‘মালভিনাস’–সংক্রান্ত স্লোগান লিখে সেটিকে ব্যানারের রূপ দেন। পরে সেটি গোপনে স্টেডিয়ামে নিয়ে আসেন। ম্যাচ শেষে সেই ব্যানারই কোনোভাবে খেলোয়াড়দের হাতে পৌঁছে যায় এবং উদ্যাপনের সময় তারা সেটি সবার সামনে প্রদর্শন করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমে দর্শক গ্যালারিতে থাকা ব্যানারটি দেখতে পান আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো। এরপর তিনি বিজ্ঞাপন বোর্ড টপকে সমর্থকের কাছ থেকে ব্যানারটি সংগ্রহ করেন। পরে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি মাঠে প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এরপর ক্রিস্তিয়ান রোমেরোসহ আরো কয়েকজন ফুটবলার ব্যানারটি হাতে নিয়ে বিজয় উদ্যাপনে অংশ নেন। এ সময় গ্যালারি থেকে ইংল্যান্ডবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানও শোনা যায়, যা পুরো ঘটনাকে আরো বিতর্কিত করে তোলে।
আরো পড়ুন : মেসিকে নিয়ে উচ্ছ্বাস, বিপাকে ব্রাজিলিয়ান ধারাভাষ্যকার
ফিফার বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ভেতরে খেলোয়াড় বা সমর্থকদের রাজনৈতিক বার্তা বা প্রতীক প্রদর্শন নিষিদ্ধ। ফলে এই ঘটনার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও আলোচনা চলছে।
আরো জানা গেছে, ম্যাচ শেষে ব্যানারটি আর্জেন্টিনা দলের শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। দলের একজন কর্মকর্তা হোটেলে রাখা সেই ব্যানারের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে লেখেন, ‘যাদের জানার প্রয়োজন, তাদের জন্য বলছি—এটি নিরাপদ হাতেই রয়েছে।’
এদিকে আর্জেন্টিনার একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দলটি মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের প্রবীণ যোদ্ধাদের জন্য খেলোয়াড়দের স্বাক্ষর করা একটি জার্সিও পাঠিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তার এক আত্মীয়ই হোটেলের চাদরে ওই ব্যানারটি এঁকেছিলেন। তবে সম্ভাব্য শাস্তির আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল। তিনি এই ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অনুচিত’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা পুরো ম্যাচে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেছে, যা আর্জেন্টিনার আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিরোধী দলের নেতা অ্যান্ড্রু গ্রিফিথও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই কর্মকাণ্ড বিশ্ব ফুটবলের নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
যদিও এখন পর্যন্ত ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংস্থাটির ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে রোমেরো ও মার্তিনেসের ক্লাবগুলোর প্রতিও তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনার নজির অবশ্য নতুন নয়। প্রায় ১২ বছর আগে একটি প্রীতি ম্যাচে একই ধরনের রাজনৈতিক ব্যানার প্রদর্শনের দায়ে আর্জেন্টিনাকে জরিমানা করেছিল ফিফা। তবে এবার বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে একই ধরনের ঘটনা ঘটায় আরো কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ‘জিব্রাল্টার স্পেনের’ স্লোগান দেওয়ায় স্পেনের দুই ফুটবলার রদ্রি ও আলভারো মোরাতাকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধে মোট ৯০৭ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৫৫ জন ছিলেন ব্রিটিশ সেনাসদস্য। দ্বীপপুঞ্জটির মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের বিরোধ আজও অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগেই এই ইস্যু নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। শেষ ষোলোতে মিসরকে হারানোর পরও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মালভিনাস ইস্যুতে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
সেমিফাইনাল জয়ের পর আর্জেন্টিনার উপ-রাষ্ট্রপতি ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘এটি শুধু আরেকটি ম্যাচ ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার। স্টেডিয়ামে পতাকা নিতে বাধা দেওয়া গেলেও আমাদের রক্ত আর হৃদয় থেকে তা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।’
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা যুক্তরাজ্যের অধীনেই থাকার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
