আর্জেন্টিনা সমর্থকদের গর্জন, ব্রাজিল ভক্তদের নীরবতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৭ এএম
ছবি ; সংগৃহীত
বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে অন্যরকম এক আবহ। ছাদে উড়তে থাকে নানা দেশের পতাকা, চায়ের দোকানে জমে ওঠে তর্ক আর বড় পর্দার সামনে গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকেন হাজারো ফুটবলপ্রেমী। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে দৃশ্যটা কিছুটা ভিন্ন। মাঠে নেই ব্রাজিল। ফলে দেশের অসংখ্য ব্রাজিল সমর্থকের জন্য এবারের ফাইনাল এক ধরনের আবেগের পরীক্ষা। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠায় তাদের সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ আগেই শুরু হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ এলেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অনেকের কাছে এটি শুধু ফুটবল নয়, বরং দীর্ঘদিনের আবেগ ও পরিচয়ের অংশ। কিন্তু প্রিয় দল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর সেই সমীকরণ বদলে যায়। অনেক ব্রাজিল সমর্থক এরপরও ফাইনাল দেখেন শুধুই ভালো ফুটবলের জন্য। কেউ স্পেনকে সমর্থন করেন, কেউ আবার নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে উপভোগ করতে চান শিরোপা নির্ধারণী লড়াই।
রাজধানীর মিরপুরের ব্রাজিল সমর্থক মাহমুদ হাসান বলেন, “ব্রাজিল না থাকায় মন খারাপ তো আছেই। তবু বিশ্বকাপের ফাইনাল মিস করব না। আমরা বন্ধুরা মিলে বড় পর্দায় খেলা দেখব, তবে এবার তর্কের চেয়ে খেলা উপভোগ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
“ব্রাজিল বাদ যাওয়ার পর অনেকেই বলেছিল ফাইনাল দেখব না। কিন্তু বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ তো শেষ ম্যাচই। আমি নিরপেক্ষ থেকে ভালো ফুটবল দেখতে চাই।”
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আড্ডায় কিছু ব্রাজিল সমর্থকের মধ্যে বিতর্কিত মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ দাবি করছেন, টুর্নামেন্টে রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং ফাইনালেও তারা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের আশঙ্কা করছেন।
সমর্থকরা বলছেন “আমাদের মনে হয়েছে টুর্নামেন্টে কিছু সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। তাই ফাইনালে যেন আর কোনো বিতর্কিত রেফারিং না হয়, সেটাই চাই। ম্যাচের ফল যেন শুধু মাঠের খেলায় নির্ধারিত হয়।”
এছাড়াও “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছে আবারও ‘রিগড’ ম্যাচ হতে পারে। সমর্থকরা চান না এমন কোনো বিতর্ক তৈরি হোক। যে দল ভালো খেলবে, সেই দলই ট্রফি জিতুক।”
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে এই ফাইনাল শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়। ২০২২ সালের পর টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা, লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায় এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ সব মিলিয়ে তাদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার প্রস্তুতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং পতাকা সাজানোর ব্যস্ততা সেই উচ্ছ্বাসেরই প্রতিফলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আর্জেন্টিনা সমর্থক তানজিম আহমেদ বলেন, “ফাইনালের দিন আমরা হলের সামনে বড় পর্দায় খেলা দেখব। জার্সি পরে সবাই একসঙ্গে জড়ো হব। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস দেখতে চাই।”
“২০২২ সালের মতো ম্যাচ জিততে পারলে রাতেই ছোট্ট একটা উদযাপনের পরিকল্পনা আছে। জিতলে ভোর পর্যন্ত উদযাপন চলবে।”
বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সমর্থনের সীমা অনেক সময় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা যে দলই মাঠে থাকুক, বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলোকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমে না। বরং প্রিয় দল বিদায় নেওয়ার পরও অনেক সমর্থক কৌশল, ইতিহাস কিংবা প্রিয় কোনো ফুটবলারের জন্য অন্য দলের খেলাও অনুসরণ করেন।
ফাইনালের রাতে তাই বাংলাদেশে একই সঙ্গে দেখা যাবে দুই ধরনের আবেগ। একদিকে থাকবে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রত্যাশা ও উদযাপনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে থাকবে ব্রাজিল সমর্থকদের অপূর্ণতার অনুভূতি, বিতর্ক নিয়ে আলোচনা, তবে সেই সঙ্গে থাকবে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ উপভোগ করার আগ্রহও।
মাঠে শিরোপার লড়াই হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যে, কিন্তু বাংলাদেশের অলিগলি, ক্যাম্পাস, চায়ের দোকান আর বড় পর্দার সামনে ফুটে উঠবে দেশের নিজস্ব ফুটবল উন্মাদনার এক অনন্য রূপ।
শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করছে, বাংলাদেশে ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি স্মৃতি, আবেগ, বন্ধুত্ব, তর্ক, উদযাপন এবং একসঙ্গে জেগে থাকার এক সামাজিক উৎসব।
