আর্জেন্টিনাকে প্রতিনিধিত্ব করা আমার জীবনের সেরা অর্জন: মেসি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শেষ ম্যাচ খেলেছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন এই তারকা। বিদায়ী ম্যাচ শেষে আবেগঘন বক্তব্যে মেসি বলেছেন, আর্জেন্টিনাকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব ও অর্জন।
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরের ম্যাচে বেনিনকে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলের জয়ে গোল করেছেন মেসি নিজেও। নিকো পাজ ও নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। ম্যাচ শেষে দীর্ঘ বক্তব্যে চোখের জলে সতীর্থ ও সমর্থকদের বিদায় জানান মেসি।
মেসি বলেন, ‘আজ কী বলব, সত্যিই বুঝতে পারছি না। মনের ভেতর এত আবেগ, এত কিছু একসঙ্গে ঘুরছে। সবার আগে আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি।’
দুই দশকের বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারাকে নিজের জন্য বিশাল সম্মানের বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০ বছরের বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল বিরাট সম্মানের। আমরা সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও গিয়েছি। কিন্তু কখনো লড়াই থামাইনি। কখনো নিজের সর্বস্ব দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসিনি।’
জাতীয় দলকে বিদায় বলার সিদ্ধান্ত যে তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের, সেটিও জানান মেসি। তিনি বলেন, ‘ফিরে আসতে না পারার ভাবনাটা ভীষণ কষ্টের। সত্যি বলছি, সারা জীবন আমি এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছু একজন ফুটবলারের জীবনে হতে পারে না। আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়।’
শেষ বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করে মেসি বলেন, ‘শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য ছিল অনেক বেশি কিছু। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। খুব কাছেও চলে গিয়েছিলাম। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম। তারপরও আমরা লড়েছি, যেমন সব সময় লড়েছি—এই জার্সির জন্য, আমার সঙ্গে যে সতীর্থরা এতটা পথ হেঁটেছে, তাদের জন্য।’
সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, সেটার জন্য। ওরাই আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন, আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন, ফিনালিসিমা জেতার স্বপ্ন।’
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ভালোবাসার কথাও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান যে পুরো দেশ ঘুরে খেলার সুযোগ পেয়েছি। আর যেখানেই গিয়েছি, পেয়েছি মানুষের অসাধারণ ভালোবাসা। ম্যাচ যে ধরনেরই হোক—বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা অন্য কোনো ম্যাচ—মানুষ সব জায়গায় এসেছে। অনেক কষ্ট করে এসেছে।’
মেসি আরও বলেন, ‘যেখানেই গিয়েছি, সব সময় মনে হয়েছে, আমরা যেন নিজেদের মাঠেই খেলছি। মানুষ আমাদের আপন করে নিয়েছে। আমরা সেটা সত্যিই অনুভব করেছি।’
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ জয়ের পর ফিরে আসার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। মেসি বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি এই মাঠেই এসেছিল। বিশ্বকাপ জেতার পর আমরা যখন এখানে ফিরে খেলেছিলাম, সেদিনের অনুভূতি আমি কখনো ভুলব না। আজও সেই দিনের ভিডিও দেখি, আর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।’
তবে বিদায়ী ম্যাচের দিনটিকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আজ আবার এই মাঠে ফিরে এসে সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটা অনুভব করছি। কারণ আজই জাতীয় দলকে বিদায় বলছি। জাতীয় দলের রং গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামাটা আমি ভীষণ মিস করব।’
এরপর থেকে সমর্থক হিসেবে দলের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মেসি বলেন, ‘এখন থেকে আমি থাকব ওই পাশে। তোমাদের সঙ্গেই। এই ছেলেদের জন্য গলা ফাটাব। সামনে যা আসবে, তার জন্য তাদের সমর্থন করব। সব সময় একসঙ্গে থাকব।’
জাতীয় দলের কঠিন সময়ে সমর্থকদের আরও বেশি পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সামনে কঠিন সময় আসবে। নিশ্চিতভাবেই আসবে। কারণ আমরা এই সময়ে যা অর্জন করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। তাই কঠিন সময় এলে আমাদের আরও বেশি করে এই ছেলেদের পাশে থাকতে হবে।’
ঐক্যবদ্ধ দলই সাফল্যের চাবিকাঠি উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হয়। কারণ এমন কিছু মানুষ আছে, যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না।’
সবশেষে আবেগাপ্লুত মেসি বলেন, ‘আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। শুধু আপনাদের একটা কথা বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের ভীষণ মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন।’
‘আমি আর্জেন্টাইন, এটাই আমার গর্ব। আর আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি, সেটাও আমার সবচেয়ে বড় গর্ব। আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’
