সিজিএস-এর সংলাপে বক্তারা
নারীর ক্ষমতায়নে দরকার রাজনৈতিক দলের মানসিকতা ও নীতির পরিবর্তন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
সিজিএস-এর সংলাপে উপস্থিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারী তরুণ নারী রাজনীতিকরা। ছবি: সংগৃহীত
তরুণ নারী রাজনীতিকদের মধ্যে মতাদর্শভিত্তিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারের লক্ষ্যে ধারাবাহিক চারটি কর্মশালার পর সমাপনী সংলাপের আয়োজন করেছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)। জার্মান ভিত্তিক রাজনৈতিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠান ফ্রেডরিখ এবার্ট স্টিফটুং (এফইএস)-এর সহযোগিতায় সংলাপে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী তরুণ নারী রাজনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকার একটি হোটেলে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এফইএস-এর বাংলাদেশ রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেডেস, সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, এবি পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএস-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।
আরও পড়ুন: পরিধি বেশি, গতি বাড়াতেই পররাষ্ট্রে দুই প্রতিমন্ত্রী: শামা ওবায়েদ
অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দল ও মতের নারীরা একসঙ্গে কাজ করেছেন এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির জন্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ ব্যবহারে নারীদের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা যেন সমাজের সব ক্ষেত্রে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সে জন্য আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন এবং সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে জাতীয় নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। দেশের ৫০ শতাংশ নারীকে পিছিয়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়; তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা ও নীতিতে পরিবর্তন এনে তৃণমূল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, শিক্ষা নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। তবে রাজনীতি ও সমাজে অনলাইন হয়রানিসহ নানা বাধা এখনো রয়েছে। এসব মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। নারীদের সহায়তা করা একটি নীতিগত বিষয় হওয়া উচিত। এই পথ কখনোই সহজ নয়। যত বাধাই থাকুক, নারীদের মেধা ও আত্মসম্মান নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, নারীর অধিকার প্রশ্নে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এক হতে হবে। তিনি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন, মূল্যবোধভিত্তিক নৈতিক নেতৃত্ব এবং পেশাগত পরিচয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, কীভাবে কেউ এগিয়ে এসেছে তার চেয়ে সমাজে কতটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নারীর অধিকার মানবাধিকারেরই অংশ; তাই মেধা, আত্মবিশ্বাস ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নারীদের নিজস্ব পথ তৈরি করতে হবে।

জলি তালুকদার বলেন, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি নারীদের এগিয়ে আসার পথে বড় বাধা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনীহা, দলীয় কাঠামো এবং পরিবারে সম্পত্তিসহ সামাজিক বৈষম্য দূর না হলে এর প্রভাব রাজনীতিতেও থেকে যাবে।
ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, নারী নেতৃত্ব হলো আমরা কতদূর এগিয়েছি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে। নেতৃত্ব শুধু সংখ্যায় নয়, গুণগত ও অর্থবহ হতে হবে; রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা নারীদের ন্যায্য অধিকার।
মনিরা শারমিন বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ এবং নতুন নারী নেতৃত্ব তুলে আনতে অনীহা দেখায়। সাইবার বুলিং প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা এবং সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
ফেলিক্স গ্রেডেস বলেন, এফইএস স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ন্যায়বিচারের অংশ এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নারীদের আরও বেশি সুযোগ, স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রয়োজন। নারীর অংশগ্রহণ শুধু অধিকারের বিষয় নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাঁদের অর্থবহ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।
পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আদর্শগত পার্থক্য নির্বিশেষে নারীদের শক্তিশালী করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল। তিনি বলেন, নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ, যা পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের প্রেক্ষাপটে আরও গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপ শেষে বিগত কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ প্রদান করা হয়।
