দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
ইরান যুদ্ধে কৌশলগত চাপে যুক্তরাষ্ট্র
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযান চালিয়েও ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও ইরানের নীতি বা আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতিকে অনেক মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর চাপ বেড়েছে। এতে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরিসরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে এবং রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এটিকে ওয়াশিংটনের দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে এবং একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সামরিক চাপের মধ্যেও ইরান আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা বজায় রেখেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মূল্যায়নে হরমুজ প্রণালিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও ওমানের আলোচনাও বর্তমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় তেহরান এই প্রণালিকে গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
আরো পড়ুন: ইন্দোনেশিয়ায় চলন্ত ফেরিতে আগুন, নিহত ৫
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরান তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণকারী সরকারের অধীনে রয়েছে। দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর প্রভাবও বহাল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল- উভয়ই তুলনামূলকভাবে চাপে পড়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলমান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদারের চেষ্টা করছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজের মন্তব্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মিত্র দেশ মনে করছে, বর্তমান সংঘাত তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। তাই তারা একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেও কৌশলগত মতপার্থক্য বেড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়েও ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্পের আগের কিছু পররাষ্ট্রনীতি ও ন্যাটো-সংক্রান্ত অবস্থান ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার অবস্থান ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেটের মূল্যায়নও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করছে এবং এটি দেশটির নিরাপত্তা-নির্ভর মিত্রদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সংঘাতটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও পুনরায় উত্তেজনার চক্রে রূপ নিতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
