×

আন্তর্জাতিক

নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম

ইরান যুদ্ধ কি ডেকে আনছে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সংঘাত?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

ইরান যুদ্ধ কি ডেকে আনছে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সংঘাত?

প্রতীকী ছবি

ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা রূপ নেবে বৈশ্বিক সংকটে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধকৌশল, হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা নিয়ে এমন আশঙ্কাই তুলে ধরছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এই যুদ্ধ গোটা বিশ্বকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অসাংবিধানিক যুদ্ধ শুরু করার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, সেই যুদ্ধের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। গত বুধবার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যদের ওপর ‘খেপে গেছেন’।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে একমত হতে পারছেন না। কিন্তু তারা একমত হবেনই বা কীভাবে? কারণ জয়ের প্রতিটি পথেই বিপজ্জনক সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে, আর বর্তমান পথে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো নিশ্চিত কৌশলগত পরাজয়।

ভুল কৌশলের মাশুল

এই যুদ্ধের ফল এমন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সরকারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। অথচ ইরাক সরকারকে হটাতে যে পরিমাণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে তার চেয়ে অনেক কম শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তাহলে ট্রাম্প আসলে কী আশা করেছিলেন?

আমরা সবাই জানি, তিনি ভেবেছিলেন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা এবং কল্পিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে সহজে উপড়ে ফেলা যাবে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তিনি এই একই ব্যর্থ কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। সেখানে ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের জন্য তার কাছে কোনো ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না। তার একমাত্র ভরসা ছিল ইরানের ওপর আরও বোমা বর্ষণ করা এবং তাদের আত্মসমর্পণের আশা করা।

হরমুজ যুদ্ধের অবসান কীভাবে সম্ভব

বাস্তবে ওয়াশিংটন এখনো সেই একই পথে হাঁটছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো একপর্যায়ে গিয়ে ইরান বলবে যে তারা আর চাপ সহ্য করতে পারছে না।’

অথচ পরদিনই তিনি তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো আমাদের হামলা বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছে। বিশ্ববাসীর কল্যাণ এবং একটি সমৃদ্ধ ইরানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমি হামলা বাতিল করতে রাজি হয়েছি, যাতে দ্রুত একটি চুক্তি করা যায়।’

নিয়ন্ত্রণহীন সংকট

তবে আমাদের বর্তমান সমস্যা চুক্তির চেয়েও অনেক গভীর। আমেরিকা দীর্ঘকাল ধরে এতটাই শক্তিশালী যে আমরা সবসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভ্যস্ত। আমরা যখন খুশি যুদ্ধ শুরু করি এবং ভাবি যখন খুশি তা শেষও করতে পারব। আমি যখন ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম, তখন যুদ্ধক্ষেত্র যতই ভয়াবহ হোক না কেন, আমরা জানতাম সংকটটি সীমাবদ্ধ রয়েছে।

আমরা এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছিলাম, যাদের ইরাকের বাইরে মার্কিন নাগরিকদের ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতা ছিল না। আফগানিস্তানে আল-কায়েদার ঘাঁটি ধ্বংস করার পরও একই পরিস্থিতি ছিল।

ইরাক ও আফগানিস্তানে তীব্র লড়াই হলেও আমাদের প্রধান বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা (রাশিয়া ও চীন) মূলত অনুপস্থিত ছিল। মার্কিন পরাশক্তি, শত্রুর দুর্বলতা এবং রাশিয়া-চীনের সংযমের কারণে মার্কিন নাগরিকেরা নিরাপদে ঘুমাতে পারতেন। কারণ তখন বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু পরিস্থিতি এখন আর তেমন নেই। পৃথিবী আজ বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ কেউই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে নেই।

সংঘাতের বিশ্বায়ন

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান শুধু মার্কিন ঘাঁটিতেই সফল হামলা চালাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অংশীদারদের ওপরও অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ইয়েমেনের হুথিরা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় লড়াই এখন লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। হুথিদের নৌ-অবরোধ ভাঙতে সৌদি আরব এখন ইয়েমেনে বড় ধরনের স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে রাশিয়া ও ইরানের সীমান্তবর্তী কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের দাবি, জাহাজটি দুই দেশের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করছিল।

অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন হয়তো কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) তথ্য দিয়ে ইরানি বাহিনীকে সহায়তা করছে, যার ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাগুলো আরও নিখুঁত হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চীন ইরানে শত শত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাচ্ছে।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে ন্যাটো জানিয়েছে, একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র সীমান্ত পেরিয়ে পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম কোনো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রে আঘাত হানল। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে নতুন করে লাখ লাখ সৈন্য নিয়োগের (ম্যাস মোবিলাইজেশন) কথাও বিবেচনা করছে।

আমেরিকার দুই সামরিক দুর্বলতা

এই পুরো সংকটটি আমেরিকার দুটি বড় সামরিক দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

প্রথমত, ইরান প্রমাণ করেছে যে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ঘাঁটিগুলো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আমি যখন ইরাকে ছিলাম, তখন মার্কিন ঘাঁটির এত বড় ক্ষতি হওয়া কল্পনারও বাইরে ছিল। আল-কায়েদার কোনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না, এমনকি সাদ্দাম হোসেনও ইরানের মতো এত নিখুঁতভাবে পুরো অঞ্চলে আঘাত হানতে পারেননি। যদিও এই যুদ্ধে ইরান তাদের শীর্ষ নেতৃত্বসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। কিন্তু ইরানের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী আমাদের মতো জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরোয়া করে না।

দ্বিতীয়ত, আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর (যেমন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র) এবং অন্যান্য উন্নত গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে আসছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ড্রোন ধ্বংস করাও একধরনের পরোক্ষ পরাজয়। কারণ মাত্র ৩৫ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যখন আপনাকে ৪০ লাখ ডলারের একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ট্রাম্প প্রশাসন এই ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের জন্য জো বাইডেনকে দায়ী করছে। কিন্তু তাদের আচরণেই স্পষ্ট যে মার্কিন গোলাবারুদের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। এ কারণেই হয়তো ট্রাম্পের নীতিতে বারবার হামলা চালানো এবং আবার তা স্থগিত করার মতো সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যাচ্ছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

আমি প্রায়ই ভাবি, ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মকালে অথবা ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে বেঁচে থাকা মানুষগুলো কেমন অনুভব করেছিল? তারা কখন বুঝতে পেরেছিল যে পৃথিবী এক মহাসংকটের মুখোমুখি? বেশি আগে বা বারবার বিশ্বযুদ্ধের কথা বললে মানুষ আপনাকে ‘পাগল’ ভাববে, আর দেরিতে সচেতন হলে হয়তো বেঁচে থাকার আফসোসটুকুও করার সুযোগ মিলবে না।

আমি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছি না, এখনো উত্তেজনা কমার আশা রাখি। তবে বর্তমান ধারা ও ঘটনাগুলো সংঘাত আরও বাড়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ট্রাম্পের মতো ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’ ভেবে আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

আমি মনে করি না যে বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য বা খুব আসন্ন। তবে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। দুর্ভাগ্যবশত, এই সংকটময় মুহূর্তে আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অযোগ্য শাসকেরা দেশটির নেতৃত্বে রয়েছেন। আর মার্কিন কংগ্রেস পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে প্রেসিডেন্টের অনুগত হয়ে পড়েছে।

আমাদের ভবিষ্যত এখন নির্ভর করছে মার্কিন ভোটারদের ওপর। একটি ভয়াবহ যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে গ্রাস করার আগেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের এখনই সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে।

লেখক পরিচিতি

ডেভিড ফ্রেঞ্চ মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একজন নিয়মিত কলামিস্ট। তিনি একাধারে লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক আইনজীবী। ডেভিড ফ্রেঞ্চ মার্কিন ইরাক যুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তা (জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল কোর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার বিশ্লেষণাত্মক লেখাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত প্রভাবশালী।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাতক্ষীরায় হাসপাতালে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৪ ইউনিট

সাতক্ষীরায় হাসপাতালে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৪ ইউনিট

ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: জকসু এজিএসসহ বেশ কয়েকজন আহত

ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: জকসু এজিএসসহ বেশ কয়েকজন আহত

কোটি টাকার পাহাড় গড়েও ব্রুনোকে পেল না আর্সেনাল

কোটি টাকার পাহাড় গড়েও ব্রুনোকে পেল না আর্সেনাল

জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না, এটা হবে চরম নিমকহারামি

ডা. শফিকুর রহমান জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না, এটা হবে চরম নিমকহারামি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App