নাইন-ইলেভেন ট্র্যাজেডি, যেভাবে বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ঘটে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। এদিন নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া ভবন ‘টুইন টাওয়ার’ এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগন লক্ষ্য করে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তী সময়ে এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের প্রধান দুটি ভবনের নাম ছিল নর্থ টাওয়ার ও সাউথ টাওয়ার। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই দুটি ভবনই ‘টুইন টাওয়ার’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে সন্ত্রাসীরা চারটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সমন্বিত হামলা চালায়। এর মধ্যে দুটি বিমানকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই টাওয়ারে আঘাত করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
ওই দিন সকাল থেকেই শহরের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই যার যার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এরই মধ্যে সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। এর প্রায় ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে। মুহূর্তেই দুটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিমান আঘাত ও পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডে ভবন দুটির কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে ধসে পড়ে নর্থ ও সাউথ টাওয়ার পরিণত হয় ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডিতে। তবে হামলা শুধু নিউইয়র্কে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছিনতাই করা তৃতীয় বিমানটি ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আঘাত হানে। আর চতুর্থ বিমানটি যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনা পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
আরো পড়ুন: স্কুল ভবনে ভয়াবহ আগুন, নিহত ২৯ শিশু
মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং ৯/১১ মেমোরিয়ালের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অংশ নেওয়া ১৯ জনই আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং তারা সংগঠনটির প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে আল-কায়েদার তৎকালীন নেতা ওসামা বিন লাদেনের সংশ্লিষ্টতা পরবর্তী তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ হামলাকারীর মধ্যে ১৫ জন সৌদি আরবের, দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের, একজন মিসরের এবং একজন লেবাননের নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রে বিমান চালনার প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। সেই দিন সন্ত্রাসীরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সেগুলোকে হামলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। দুটি বিমান নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে এবং একটি পেন্টাগনে আঘাত করে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রী ও ক্রুরা অন্য হামলার খবর জানতে পেরে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর পর বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে না গিয়ে পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
৯/১১ হামলায় কতজন নিহত হন?
৯/১১ হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে নিউইয়র্কে ২ হাজার ৭৫৩ জন, পেন্টাগনে ১৮৪ জন এবং ফ্লাইট ৯৩-এ ৪০ জন নিহত হন। নিহতরা ৯০টি দেশের নাগরিক ছিলেন। নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষ ছাড়াও বহু পুলিশ, দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মী ছিলেন। ৯/১১ হামলায় নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ জন দমকলকর্মী, পোর্ট অথরিটি পুলিশের ৩৭ জন কর্মকর্তা এবং নিউইয়র্ক পুলিশের ২৩ জন কর্মকর্তা প্রাণ হারান।
হামলার পর কী পরিবর্তন আসে?
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এফবিআই তাদের তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধকে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হয়। হামলার পর আফগানিস্তানে আল-কায়েদার বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হয়। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন।
টুইন টাওয়ার এখন ইতিহাসের অংশ
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের জায়গায় পরবর্তীতে ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। হামলায় নিহত ২ হাজার ৯৭৭ জনের স্মরণে সেখানে স্মৃতিচিহ্ন তৈরি করা হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা আজও আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
