×

আন্তর্জাতিক

ছাত্র আন্দোলনে সার্বিয়ার ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটল যেভাবে

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

ছাত্র আন্দোলনে সার্বিয়ার ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটল যেভাবে

যদিও সার্বিয়ার নির্বাচনে একটি ছাত্র আন্দোলন জয়লাভ করেছে, কিন্তু কোনো ছাত্র নির্বাচিত হননি। ছবি: সংগৃহীত

একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দুর্নীতি ও সরকারি অবহেলার বিরুদ্ধে রাজপথে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ রূপ নিয়েছিল জাতীয় আন্দোলনে। দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের ১৪ বছরের রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্ট উইন’ তালিকা ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে, ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। রোববারের এই নির্বাচন সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কার্যত গণভোটে পরিণত হয়েছিল।

সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরের আগে প্রকাশিত প্রাথমিক পরিসংখ্যানের পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ নোভি সাদ ও নিশের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন আন্দোলনের সমর্থকেরা। শিক্ষার্থীদের সদর দপ্তরের সামনেও জড়ো হন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, ‘সার্বিয়া স্বাধীন’।

প্রতীকী তাঁবু শিবিরের পতন

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল ‘চাচিল্যান্ড’ নামে পরিচিত তাঁবু শিবিরটির পতন। মধ্য বেলগ্রেডের পাইওনিয়ার্স পার্কে সার্বিয়ার পার্লামেন্টের সামনে প্রায় ১৮ মাস আগে শিবিরটি স্থাপন করা হয়েছিল। এটি ছিল ভুচিচ-সমর্থকদের একটি তাঁবু শিবির।

‘ভুচিচ চলে যাচ্ছেন’ স্লোগান দিয়ে সেখানে স্থাপিত ধাতব বেড়া ভেঙে ফেলেন আন্দোলনকারীরা। ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যেভাবে বদলে গেল সার্বিয়ার রাজনীতি

‘দ্য স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে পরিচিত এই আন্দোলনের কোনো সুস্পষ্ট নেতা নেই। এর সদস্যদের অনেকেরই প্রচলিত রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্ট উইন’ ব্যানারে তারা সার্বিয়াজুড়ে সরকারবিরোধী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন।

আন্দোলনকারীরা সংসদের ২৫০টি আসনের সব কটিতে প্রার্থী দিয়েছিলেন। তবে সেই তালিকায় কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না। বরং বিভিন্ন পেশার পরিচিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নেয় তারা।

গত সপ্তাহে বেলগ্রেড অভিমুখে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় যোগ দেন তালিকার প্রধান প্রার্থী ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সিদানোভিচ। তিনি বলেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং এই শক্তিকে থামানো সম্ভব নয়।

বিবিসিকে সিদানোভিচ বলেন, ‘আমরা নাগরিকদের সভ্য সমাজের মৌলিক মূল্যবোধের কথা বলেছি, যা আগের সরকার তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল।’

সবকিছুর সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। দুর্ঘটনাটি দেশটিতে ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

সমালোচকদের অভিযোগ, রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজে গুরুতর ত্রুটি ছিল এবং প্রকল্পটির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ভুচিচের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা ছিল। এই অভিযোগ ঘিরে সরকারের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের

গবেষণা সংস্থা হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির হেলেনা ইভানভ বলেন, ‘ছাউনিটি ধসে পড়ার ঘটনাই ছিল শেষ আঘাত।’ তাঁর মতে, ঘটনাটি মানুষের মধ্যে গভীর আবেগ ও ক্ষোভ তৈরি করে, যা দেশজুড়ে মিছিল ও বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। আন্দোলনটি সার্বীয়দের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল এমনভাবে, যা প্রচলিত কোনো বিরোধী দল পারেনি।

রাজপথের বিক্ষোভ থেকে ভুচিচকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের রাস্তায় ন্যায়বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হলেও তা দ্রুত জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। কৃষক, অভিনেতা, বিচারকসহ সার্বীয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ভুচিচের এসএনএস সরকারের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

এরপর ওই বছরের মার্চে বেলগ্রেডে সার্বিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্বহীন এই ছাত্র আন্দোলন নিজেদের সংগঠিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সাধারণ সভা বা ‘প্লেনাম’ পদ্ধতি অনুসরণ করে।

গত মাসে ভুচিচ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়ার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। হেলেনা ইভানভের ভাষ্য, তারা রাজপথের আবেগ ও জনসমর্থনকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কৌশলও কর্মীদের শেখানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের বলকান কর্মসূচির প্রধান গোরদানা ডেলিক বলেন, আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা—আইনকে ব্যবহার করে শাসন চালানো নয়। তাঁর মতে, রোববারের নির্বাচন কার্যত একটি গণভোট ছিল।

আলেক্সান্ডার ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করলেও বলেছেন, ছাত্র আন্দোলন ব্যর্থ হবে

শুরুতে ভুচিচ বিক্ষোভকারীদের ‘সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও নির্বাচনের আগে তিনি তাদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ আনেন। নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করার পরও তিনি দাবি করেন, নাম উল্লেখ না করা কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’ আন্দোলনকারীদের সমর্থন দিয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।

এখন সার্বিয়া কে চালাবেন?

নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা নিজেরা প্রার্থী হননি। বরং বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে তালিকা তৈরি করেছিলেন তারা। ভোটাররা স্বল্প রাজনৈতিক ও জীবন-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রার্থী হিসেবে কতটা গ্রহণ করতেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

তালিকার প্রধান প্রার্থী নোভি সাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সিদানোভিচ হলেও তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খুব বেশি আলোচনায় দেখা যায়নি। অন্যদিকে, তালিকার বেশির ভাগ প্রার্থীর মধ্যেও সম্ভাব্য নেতৃত্বের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান তৈরি হয়নি।

স্বাধীন জরিপ সংস্থা সিইএসআইডি ও ইপসোসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা থেকে ১৪০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেইয়ান বোডিরোগা, প্রখ্যাত অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ, অপেরা গায়ক নিকোলা মিকিচ এবং সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেইয়ান শশকিচ। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাপক।

সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় শশকিচের নামও এসেছে। অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং সরকারপন্থি গণমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে সমালোচনা এ আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে।

দুর্নীতি দমন থেকে গণমাধ্যম সংস্কার—যা করতে চায় ছাত্র আন্দোলন

নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিদের ওপর কার্যত আন্দোলনের নির্বাচনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তারা এমন ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছেন, যারা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় নিজেদের কর্তব্য ভুলে যাবেন না।

আন্দোলনের ১১ দফা কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলো হলো—

দুর্নীতি দমন: দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংস্কার: বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নে নিয়ম লঙ্ঘনকারী এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপসারণ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যমের সংস্কার এবং সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা।

প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ বন্ধ: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধ করা।

তবে ভুচিচ ও তাঁর দল এসএনএস দুর্নীতির অভিযোগ এবং গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত না হলেও আন্দোলনের দায়িত্ব তাদেরই

শিক্ষার্থীরা নিজেরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য তাঁদের ওপর চাপ থাকবে। কারণ, আন্দোলনের নেতৃত্বই সার্বিয়ার জনগণের কাছে পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিল।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, গত এক বছর ধরে রাজপথে যে সংগ্রাম চালিয়েছেন, তার একটি অংশ এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিদের ওপর পড়েছে। সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া এই প্রতিনিধিরাই সংসদে আন্দোলনের লক্ষ্য তুলে ধরবেন।

অন্যদিকে, রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে ভুচিচ তাঁর দলের সমর্থকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা সার্বিয়ার দুই বছরের জীবনযাত্রা ধ্বংস করে দিয়েছে। তাঁর দাবি, আন্দোলনকারীরা নিজেদের ধারণার চেয়েও দ্রুত পরাজিত হবেন।

তবে নির্বাচনের প্রাথমিক ফল বলছে, সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুর্নীতি ও সরকারি অবহেলার বিরুদ্ধে রাজপথে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে পারে।

সূত্র: বিবিসি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ২ প্রার্থীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ২ প্রার্থীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

জ্বালানি-প্রযুক্তি-অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক জ্বালানি-প্রযুক্তি-অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

ছাত্র আন্দোলনে সার্বিয়ার ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটল যেভাবে

ছাত্র আন্দোলনে সার্বিয়ার ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটল যেভাবে

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App