ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। তাঁর দাবি, ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালে একই ঘটনার বিষয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস।
সোমবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে যৌন অপরাধে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের কথিত সম্পর্ক এবং এপস্টেইনের অপরাধের সঙ্গে ট্রাম্পের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের বিবরণ রয়েছে। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কিউল অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। এবার ডেমোক্র্যাট কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, ওই সময় তাঁকে ধর্ষণও করেছিলেন ট্রাম্প।
প্লাজা হোটেলে কী ঘটেছিল বলে দাবি কিউলের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় কিউলের বয়স ছিল ২৪ বছর। নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তখন হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প।
কিউলের দাবি, ট্রাম্প তাঁকে ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পাশাপাশি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনওয়াইইউ) ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার দেখভাল করব।’
কিউলের সঙ্গে কথা শেষ করে ট্রাম্প সরে যাওয়ার পরপরই এপস্টেইন তাঁর কাছে আসেন বলে দাবি করেছেন সাবেক এই মডেল। এপস্টেইন নিজেকে ট্রাম্পের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁকে মার-আ-লাগোতে একটি পার্টিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপস্টেইন তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমরা ডনের সঙ্গে অনেক পার্টির আয়োজন করি।’
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি কিউলকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ জানান। সেখানে যাওয়ার পর ট্রাম্প পেছন থেকে তাঁকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন কিউল।
প্রতিবেদনে তাঁর অভিযোগের বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এ সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তপাত ও কালশিটে দাগ দেখা দেয়।
কিউল কথিত ঘটনাটিকে ‘নৃশংস’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার কিনারায় বসান এবং ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আবারও দেন। একই সঙ্গে ঘটনাটি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি চান।
প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ‘যা-ই ঘটুক, সবকিছু আগের মতো চলতে হবে।’

২০২৪ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন কিউল
২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিউল বলেছিলেন, ১৯৯৩ সালে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুমু দিয়েছিলেন এবং শরীরে স্পর্শ করেছিলেন।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি আমার ঠোঁটে ও ঘাড়ে চুমু দিয়েছিলেন। আমার পোশাক ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। শরীরের যেখানেই পেরেছেন, আমাকে ধরেছেন ও স্পর্শ করেছেন।’
তবে ওই সময় কিউলের দাবি ছিল, ঘটনা এর চেয়ে বেশি দূর গড়ায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্পকে আগে কথা বলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর ট্রাম্প শান্ত হয়ে যান।
ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার সাবেক এই মডেলের ধারণা, তাঁর শারীরিক গড়নই তাঁকে রক্ষা করেছিল এবং কথিত ঘটনাটি আরও গুরুতর পর্যায়ে যেতে দেয়নি।
ডেইলি মেইলের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কিউলের দীর্ঘদিনের এক বন্ধু দাবি করেছিলেন, ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের কথা কিউল তাঁকে প্রায় ২০ বছর আগেই জানিয়েছিলেন। বন্ধুটির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি নিয়ে কিউলের বর্ণনায় পরিবর্তন আসেনি।
অভিযোগ অস্বীকার ট্রাম্পের, পাল্টা আক্রমণ হোয়াইট হাউসের
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। তাঁর একজন মুখপাত্র ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘উন্মত্ত ডেমোক্র্যাটদের মরিয়া চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন।
মুখপাত্রের দাবি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাফল্যের কারণে রিপাবলিকানদের প্রতি বাড়তে থাকা সমর্থন থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরাতেই এসব অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।
২০২৪ সালে কিউলের অভিযোগের পর ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও সেগুলোকে ‘মিথ্যা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
ট্রাম্পের দাবি, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই তাঁদের বন্ধুত্বের অবসান হয়েছিল। তিনি এপস্টেইনকে বারবার ‘বিকৃত রুচির লোক’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন, তাঁকে মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউসের আরেক মুখপাত্রের ভাষ্য, এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পকে ‘সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত করা হয়েছে’।
আরও চার নারীর অভিযোগ প্রতিবেদনে
ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিউল ছাড়াও আরও চার নারীর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। ওই নারীরাও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প, এপস্টেইন ও তাঁদের সহযোগীরা প্লাজা হোটেলে আয়োজিত সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে অসহায় তরুণী ও কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন।
প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিনিধি পরিষদের কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য জেমি রাসকিন বলেন, পাঁচ নারী সরাসরি অভিযোগ করেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে থাকা অবস্থায় বা তাঁর উপস্থিতিতে ট্রাম্প তাঁদের ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়ন করেছেন। অন্য কয়েকজন নারী জানিয়েছেন, এপস্টেইন বা তাঁর সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁদের ট্রাম্পের কাছে পাচার করার চেষ্টা করেছিলেন।
রাসকিন আরও অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এসব অপরাধের তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এবং সেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে ট্রাম্পের ভূমিকা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলো রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তাঁর প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ও নীতিগুলো নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। নতুন এই প্রতিবেদন নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিতে পারে।
