দৌলতপুর সীমান্ত
পুশইন চেষ্টার ঘটনায় বিজিবির প্রতিবাদ, বিএসএফের অস্বীকার
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
ছবি: সীমান্তের জিরো পয়েন্টে পতাকা বৈঠকে অংশ নেওয়া বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইন চেষ্টার ঘটনায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকে বিএসএফের তরফ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিজিবির প্রতিবাদের মুখে পুশইন চেষ্টার বিষয়টি বিএসএফ অস্বীকার করেছে। সীমান্তে অবস্থানকারী ১২ জনের বিষয়ে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলেছে বিএসএফ। ফলে প্রায় ৩৮ ঘণ্টা ধরে সীমান্তে অবস্থানরত ওই ১২ জনকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমান্তেই থাকতে হচ্ছে।
শনিবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ৯টায় দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরের বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস সীমানা পিলার সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নেন।
বৈঠকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সীমান্তের কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত ওই ১২ জন নারী ও শিশুকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়। জবাবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পুশইন চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছে, তদন্ত করে তাদের পরিচয় ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করবেন বলে বৈঠকে জানায় বিএসএফ।
পতাকা বৈঠকে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়া ৪৭ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক (সহকারী পরিচালক) নূরুল হুদা এবং বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন রানীনগর কোম্পানি কমান্ডার সুনীল কুমার যাদব।
এর আগে শুক্রবার বিজিবির পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হলেও বিএসএফ তাতে সাড়া দেয়নি। শুক্রবার বিকেল ৪টায় বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিএসএফের গাফিলতির কারণে নির্ধারিত বৈঠকটি ভেস্তে যায়। ফলে পুশইনের জন্য জড়ো করে আনা ওই ১২ জনকে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় ভূখণ্ডে পাটক্ষেতের আইলে মানবেতরভাবে রাত কাটাতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুশইনের জন্য আনা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বাথানপাড়া এলাকার মৃত ওয়াসেদ আলীর ছেলে উজির আলী (৫০), তার স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), বড় ছেলে সিহাদ (১৭), মেজো ছেলে ইনজামুল (৮) এবং আড়াই বছরের শিশু সামাদ (২)। এ ছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রফিকুল গাজীর পরিবারের তিন সদস্য এবং খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আফরোজা খাতুনের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। তারা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করলেও স্থানীয় সূত্রমতে, ২০১৭ সাল থেকে তারা ভারতের কেরালায় বসবাস করে আসছেন এবং সে দেশের ভোটারও হয়েছেন। তারা কেরালায় কাজকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সেখান থেকে তাদের আটক করে প্রাগপুরের বিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
অন্যদিকে শুক্রবার দিবাগত রাতে দৌলতপুর সীমান্তের আরও দুটি আলাদা পয়েন্ট দিয়ে নতুন করে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়। প্রাগপুরের বিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে ৪ জন এবং জয়পুর সীমান্ত দিয়ে ৮ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও বিজিবির টহল ও সতর্ক অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়। পরে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে বিজিবি জানায়।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পতাকা বৈঠকে বিএসএফ পুশইনের চেষ্টার কথা অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।' তিনি জানান, বিজিবি কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ মেনে নেবে না। সীমান্তে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীও বিজিবিকে সহযোগিতা করছেন।
উল্লেখ্য, উপজেলার প্রাগপুরের বিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৪ নারী, ৪ পুরুষ ও ৪ শিশু মিলে মোট ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। টহলরত বিজিবি সদস্যরা বাধা দেওয়ায় বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ সময় স্থানীয় গ্রামবাসীও তাদের প্রতিরোধে বিজিবিকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। পরে পুশইনের শিকার হতে যাওয়া ১২ জন ভারতের অভ্যন্তরে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পাটক্ষেতের আইলে অবস্থান নেন। সেখানেই দিন-রাত পেরিয়ে প্রায় ৩৮ ঘণ্টা ধরে মানবেতর সময় পার করছেন তারা।
