প্রাক্তনকে যে ভাবে ভুলে থাকবেন
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রাক্তনের স্মৃতি সহজে মন থেকে মুছে যায় না। পুরোনো কথোপকথন, একসঙ্গে কাটানো সময় কিংবা পরিচিত জায়গাগুলো বারবার মনে পড়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কষ্ট, একাকিত্ব ও নানা ধরনের মানসিক টানাপোড়েন। তবে সময়ের সঙ্গে সঠিক কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বিচ্ছেদের পর আবেগ নিয়ন্ত্রণে সময় দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়ক হতে পারে।
আরো পড়ুন: আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
মস্তিষ্কের বায়োলজি ও ডোপামিন ডিটক্স
মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের মতে, ভালোবাসার সম্পর্কের সময় আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং সেরোটোনিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়। ব্রেকআপের পর মস্তিষ্ক হুট করে এই 'ফিল-গুড' কেমিক্যালের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঠিক মাদকাসক্তির মতো উইথড্রয়াল সিম্পটম বা তীব্র কষ্ট অনুভব করে।
জিরো কন্টাক্ট রুল
প্রাক্তনকে ভোলা এবং মস্তিষ্ককে নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর প্রথম ধাপ হলো সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল দেখা, পুরনো ছবি বা চ্যাট ঘাঁটা বন্ধ করতে হবে। আপনি যত কম তার সংস্পর্শে আসবেন, মস্তিষ্কের ডোপামিন পাথওয়ে তত দ্রুত রিসেট হবে।
নিউরোপ্লাস্টিসিটি এবং নতুন অভ্যাস গঠন
আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity) ক্ষমতার কারণে মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। পুরনো স্মৃতির নিউরাল পাথওয়াই বা স্নায়ুপথগুলোকে দুর্বল করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নতুন অভিজ্ঞতা ও অভ্যাসের জন্ম দেওয়া।
মস্তিষ্কের পরিবর্তন বুঝুন
ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সময় মস্তিষ্কে বিভিন্ন নিউরোকেমিক্যালের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। সম্পর্ক শেষ হলে সেই পরিচিত আবেগ ও অভ্যাসের হঠাৎ পরিবর্তন মানসিকভাবে অস্বস্তিকর লাগতে পারে। তাই বিচ্ছেদের পর মন খারাপ হওয়া বা প্রাক্তনের কথা বারবার মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এই অনুভূতিগুলোকে নিজের দুর্বলতা হিসেবে না দেখে বিচ্ছেদের পর স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুটা দূরত্ব তৈরি করুন
সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর বারবার প্রাক্তনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দেখা, পুরোনো ছবি কিংবা কথোপকথন ঘাঁটাঘাঁটি করলে পুরোনো আবেগ আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে কিছু সময়ের জন্য এসব থেকে দূরে থাকা যেতে পারে।
সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করা সম্ভব না হলে অন্তত অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও অনলাইন পর্যবেক্ষণ কমিয়ে আনা মানসিকভাবে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে।
আবেগ চেপে রাখবেন না
বিচ্ছেদের পর কষ্ট, রাগ, হতাশা বা একাকিত্ব অনুভব করা স্বাভাবিক। এসব অনুভূতি জোর করে চেপে রাখার পরিবর্তে নিজের আবেগকে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
ডায়েরিতে মনের কথা লেখা, ছবি আঁকা, গান শোনা কিংবা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলা অনেকের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে আবেগ প্রকাশের পাশাপাশি নিজের দৈনন্দিন দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কাজগুলো চালিয়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
জার্নালিং হতে পারে সহায়ক
প্রতিদিন নিজের অনুভূতি কয়েকটি বাক্যে লিখে রাখা মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। কী কারণে মন খারাপ হচ্ছে, কোন বিষয়গুলো বারবার মনে পড়ছে কিংবা কোন কাজগুলো করলে ভালো লাগছে—এসব লিখে রাখলে নিজের আবেগ ও চিন্তার ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
নতুন অভ্যাস ও আগ্রহ তৈরি করুন
পুরোনো সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করে নতুন কিছু শুরু করা যেতে পারে। নতুন ভাষা শেখা, বই পড়া, বাদ্যযন্ত্র শেখা, খেলাধুলা বা সৃজনশীল কোনো কাজে যুক্ত হওয়া দিনের সময়কে অর্থবহভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটির কারণে নতুন অভিজ্ঞতা ও শেখার মাধ্যমে নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে পুরোনো অভ্যাস ও স্মৃতির প্রভাবও কমে আসতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
বিচ্ছেদের পর মানসিক চাপ ও মন খারাপ কমাতে নিয়মিত শরীরচর্চা সহায়ক হতে পারে। হাঁটা, দৌড়ানো, যোগব্যায়াম বা অন্য কোনো পছন্দের ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি মেজাজ ও ঘুমের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শরীরচর্চাকে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার উপায় হিসেবে না দেখে সুস্থ থাকার একটি দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে নেওয়াই ভালো।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান
মন খারাপের সময় অনেকেই নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিতে চান। এতে একাকিত্ব আরও বাড়তে পারে। তাই পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের অনুভূতি এমন কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে, যার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা কঠিন সময় পার করতে মানসিক সমর্থন দিতে পারে।
দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনুন
পুরোনো সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত অনেক অভ্যাস বিচ্ছেদের পরও থেকে যায়। তাই দিনের সময়টাকে নতুনভাবে সাজানো যেতে পারে। পড়াশোনা, কাজ, বই পড়া, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা কিংবা সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়া মনকে ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখতে পারে।
ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেগুলো পূরণ করার অভ্যাসও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
সম্পর্কটিকে বাস্তবতার আলোকে দেখুন
বিচ্ছেদের পর অনেক সময় মানুষ শুধু ভালো স্মৃতিগুলোই মনে রাখে। ফলে মনে হতে পারে, আগের সম্পর্কটিই ছিল জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়। এমন পরিস্থিতিতে পুরো সম্পর্কটিকে বাস্তবভাবে দেখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সম্পর্কের সুন্দর মুহূর্তগুলোর পাশাপাশি যে সমস্যা, মতবিরোধ বা অসুবিধাগুলো ছিল, সেগুলোও মনে রাখা যেতে পারে। এতে অতীতকে একতরফাভাবে আদর্শায়িত করার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
নিজেকে সময় দিন
প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময় লাগে না। কারও ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ, আবার কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাই দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠার জন্য নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ঠিক নয়।
ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নিজের যত্ন নেওয়া এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান
প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়া মানে অতীতের সব স্মৃতি মুছে ফেলা নয়। বরং সেই সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতাকে জীবনের একটি অধ্যায় হিসেবে মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ ফেরানোই মূল বিষয়।
নিজের পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব, আগ্রহ ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিলে জীবনের অন্য দিকগুলো আবার অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ, অতিরিক্ত উদ্বেগ, ঘুম বা খাওয়ার সমস্যা কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে একা না থেকে বিশ্বস্ত অভিভাবক, পরিবারের সদস্য বা অন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা ভালো। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
