ইসরায়েলের ফাঁদ এড়িয়ে যেভাবে যুদ্ধ শুরু ঠেকালেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্য আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। সংঘাতের ১০০ দিন পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ বন্ধে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করতে পারেননি ট্রাম্প। বরং, গত ২৪ ঘণ্টা তাঁকে ব্যয় করতে হয়েছে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোর প্রচেষ্টায়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে—ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে তিনি হয়তো একাই যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন। ট্রাম্প বলেন, “আমি বলেছিলাম, ‘বিবি, তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে। নইলে খুব শিগগিরই তুমি একা হয়ে যাবে”।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার সকালে। ওই দিন বৈরুতে হিজবুল্লাহর একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এক ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, হামলার আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডকে (সেন্টকম) অবহিত করলেও হোয়াইট হাউসকে জানায়নি। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কয়েক দিন আগেই একই ধরনের একটি পরিকল্পিত হামলা ঠেকাতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। ফলে বৈরুতের হামলায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন।
বৈরুত হামলার পরই ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। লেবাননের রাজধানীতে হামলা হলে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি আগেই দিয়েছিল তেহরান। যদিও আইডিএফের কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, সেটি কেবল হুমকিই ছিল। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে রোববার সন্ধ্যায় নেতানিয়াহুকে ফোন করেন ট্রাম্প।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প তাঁকে পাল্টা হামলা না চালানোর অনুরোধ করেন। এক ইসরায়েলি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপের নেতৃত্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রই নেবে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও এক ইসরায়েলি সূত্রের মতে, এই ফোনালাপ কয়েক দিন আগের আলোচনার তুলনায় অনেক শান্ত ছিল। আগের আলোচনায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে এফ বর্গীয় শব্দ ব্যবহার করে গালি দিয়ে ‘পুরোপুরি পাগল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এবারের ‘ফোনালাপটি ছিল ভদ্র।’ আরেক কর্মকর্তা বলেন, দুজনের ‘কেউই চিৎকার–চেচামেচি করেনি।’
ফোনালাপে নেতানিয়াহু যুক্তি দেন, ইরানের হামলার কোনো জবাব না দিলে তা ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পের আলোচনাধীন চুক্তি, সবার জন্যই ক্ষতিকর হবে। তাঁর মতে, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালে এই বার্তা যাবে যে ইরান পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। তবে আলোচনার শেষে নেতানিয়াহু কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যা বলেছিলেন, সেটাকে কোনোভাবেই নেতানিয়াহু সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন না। তাঁকে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট এর সমর্থনে নেই। কিন্তু তিনি যা করেন, সেটাই করেন।’ পরে নিরাপত্তা প্রধান ও সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকের পর নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসকে জানান যে তিনি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল রোববারের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খুব দেরিতে’ অবহিত করেছিল। তিনি বলেন, ‘তারা তখন ইতোমধ্যে পথে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আমি (ইসরায়েলি হামলাকে) সীমিত করতে পেরেছি।’ এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, হামলার লক্ষ্যবস্তু নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে নেতানিয়াহু ও অন্য কর্মকর্তারা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর ইসরায়েল ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাগুলোর একটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তেহরানের আরও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। জবাবে ইরান তেল আবিবের দিকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সোমবার সকাল পর্যন্ত আরও কয়েক দফা হামলা ও পাল্টা হামলা হয়। এতে পরিস্থিতি সর্বাত্মক যুদ্ধের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
দুই মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলি হামলায় অংশ না নিলেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে আইডিএফকে সহায়তা করেছে। ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশ তাঁকে ফোন করে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করার অনুরোধ জানায়। তিনি বলেন, ‘এই দেশগুলো খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। আমরা যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি, তারা সেটিকে খুবই পছন্দ করে।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, সোমবার সকালে ইরানের পক্ষ থেকেও বার্তা এসেছে। তাঁর ভাষায়, ‘তারা আমাদের ফোন করে বলেছে যে তারা আর কোনো হামলা করবে না এবং ইসরায়েলকে বলার জন্য আমাদের অনুরোধ করেছে যেন তারাও আর হামলা না চালায়।’
দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের পর ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইসরায়েল। সোমবার কয়েক ডজন সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনা ছিল। ঠিক তখনই ট্রাম্প আবার নেতানিয়াহুকে ফোন করেন।
এক ইসরায়েলি সূত্র জানান, ফোনালাপে মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু সম্মত হন যে ইরান নতুন হামলা না চালালে তিনিও আর হামলা করবেন না। এরপর তিনি তাঁর শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের পরিকল্পিত অভিযান বাতিল করার নির্দেশ দেন। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী এবং খুব শিগগিরই তা স্বাক্ষরিত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে। এটি একটি অসাধারণ চুক্তি। আমরা যা চেয়েছিলাম সবই পাচ্ছি।’ তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, খসড়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য পূর্বের সমঝোতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গালিবাফের ভাষায়, ‘অন্য পক্ষের প্রতি আমাদের কোনো আস্থা নেই।’ তিনি আরও দাবি করেন, কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে লেবাননে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। তাঁর মতে, তেহরানের লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান ঘটানো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নয়।
মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্রগুলোর মতে, গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ, এমনকি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থও ক্রমশ ভিন্ন পথে যাচ্ছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইসরায়েলে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দরকার। আর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করা দরকার।’
