নেতানিয়াহুর ক্ষমতা শেষ, সরকার গড়ার দায়িত্ব পেলেন আইজেনকোট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বাদ দিয়ে তাকেই সরকার গঠনের জন্য মনোনীত করেছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। গত ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট।
শনিবার (৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় আইজেনকোটকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান হারজগ। রোববার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন জানান। তাদের মধ্যে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সদস্যরাও রয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানান ৪৬ জন আইনপ্রণেতা।
সরকার গঠনের জন্য আইজেনকোট ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে তার। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টির সমর্থন নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে হবে তাকে।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট ৪৮টি আসন পায়। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পায় ৫৩টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন কোনোটিই পায়নি। এ নির্বাচনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে।
তবে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন আইজেনকোট। যদিও তাদের সমর্থন পেলে তার জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭। এ ছাড়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম ও শাস পার্টির সমর্থন পেলে ঠিক ৬১টি আসন পাবেন তিনি। অন্যদিকে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারলে ৬১ আসনের সমর্থন ছাড়াও সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারবেন আইজেনকোট।
আলজাজিরার প্রতিবেদক নুর ওদেহ অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে প্রেসিডেন্টের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানান, আইজেনকোটকে মনোনীত করার সিদ্ধান্তটি ছিল প্রত্যাশিত। কারণ, সরকার গঠনের জন্য তার পক্ষেই সবচেয়ে বেশি আইনপ্রণেতা সমর্থন জানিয়েছিলেন।
নুর ওদেহ বলেন, এখন আইজেনকোটের সামনে কঠিন কাজ শুরু হচ্ছে। তাকে এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে, যা নেসেটে আস্থা ভোটে টিকে থাকবে। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গে আপস করতে হবে কম এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের বিরোধিতাও সামাল দিতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইজেনকোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজনকে দায়িত্ব দেবেন। দ্বিতীয় মনোনীত ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তৃতীয় একজন প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে পারবেন। ওই প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য শেষবারের মতো ১৪ দিন সময় পাবেন। এরপরও সরকার গঠন সম্ভব না হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আইজেনকোট। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম আট মাস নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় পর্যবেক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
শনিবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ সদস্য আহমেদ তিবি বলেন, হারজগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন এমন আশঙ্কা ছিল তাদের। এ ধরনের সরকারে দুই নেতার মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানায়। এতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেয়েছেন।
তিবির ধারণা, আরব দলগুলোর বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে আইজেনকোট একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারেন। তিনি বলেন, এমন সরকার আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর প্রত্যাশিত সরকার না হলেও নেতানিয়াহু, ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
হারজগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, বিরোধী জোট আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে ইসরায়েলের পতন ঘটবে। আগে থেকে ধারণকৃত এক ভিডিও বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইসলামপন্থীদের ওপর নির্ভরশীল এমন সরকার ভেতর থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যা ঘটছে, তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
ইউরোপের কিছু অংশ ইসলামী আইনের অধীনে চলে গেছে এমন মিথ্যা দাবি করে আসা কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের বক্তব্যের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এ মন্তব্যের মিল রয়েছে। নেতানিয়াহু তাদের ‘সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিবি। এর জবাবে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুই ইসরায়েল ও এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বিশেষ করে পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে।
আলজাজিরার প্রতিবেদক নুর ওদেহ বলেন, আইজেনকোট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করতে চান না। তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত।
সূত্র: আলজাজিরা
