×

মুসলিম বিশ্ব

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা: বসনীয়ার মুসলিমদের রক্তে ভেজা ইতিহাস

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা: বসনীয়ার মুসলিমদের রক্তে ভেজা ইতিহাস

ছবি : সংগৃহীত

অন্তহীন সারিবদ্ধ কবরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মুহাম্মদ হুজদিক হুদজিচ। প্রতিটি কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মিনারের মতো সাদা ফলক। নিখুঁত শৃঙ্খলায় সাজানো এই কবরগুলোর দিকে তাকালে এক অদ্ভুত নীরবতা আর শিহরণ জাগে। কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই কবরগুলো যেন কোনো এক অদৃশ্য সেনাপতির উদ্দেশে শেষ কুর্নিশ জানাচ্ছে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার 'দ্য মিস্ট অব স্রেব্রেনিৎসা' প্রামাণ্যচিত্রের প্রথম দৃশ্যেই এই ভয়াবহ রূপ ফুটে ওঠে।

মুহাম্মদ হুজদিক হুদজিচের মুখের দিকে তাকালে দ্রুতই স্পষ্ট হয়, এই গোরস্তানের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম ও পৈশাচিক ইতিহাস। এখানে যারা চিরনিদ্রায় শায়িত, তাদের একেকজনকে হত্যা করা হয়েছে নৃশংস কায়দায়। বছরের পর বছর ধরে পরিচয়হীনভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল তাদের দেহ। দীর্ঘ সময় পর সেই দেহাবশেষগুলো সংগ্রহ করে এখানে সমাহিত করা হয়েছে, যা বিশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম জঘন্যতম গণহত্যার নীরব সাক্ষী। এটিই ইতিহাসের কুখ্যাত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা।

তিন দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সেই ভয়াবহতার দাগ মোছেনি মুহাম্মদের মুখ থেকে। এই গোরস্তানে তার নিজের পরিবারেরই ৭৬ জন সদস্যের কবর রয়েছে। বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া প্রায় আট হাজার নিরস্ত্র বসনীয় মুসলিমের কয়েকজন তারা। অথচ এই খুনিরা কিছুদিন আগেও ছিল তাদের প্রতিবেশী, সহপাঠী কিংবা খেলার সাথি। এই পাশবিকতার মাঝে রেহাই পায়নি নারীরাও, প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি বসনীয় নারী সেই সময় ধর্ষণের শিকার হন।

জাতিগত বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব সাময়িকভাবে কমলেও পূর্ব ইউরোপের বুকে তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ আর জাতিগত বিদ্বেষ। ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সংঘাত বলকান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

আমেরিকান সাংবাদিক ডেভিড রিফ তার ‘বলকান ক্রাইসিস অ্যান্ড দ্য ফেইলিওর অব দ্য ওয়েস্ট’ বইয়ে লিখেছেন, যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন যখন শুরু হয়, তখন থেকেই স্পষ্ট ছিল যে ক্রোয়েশিয়ান এবং সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদীরা সীমানার চেয়ে নিজেদের জাতিগত বিশুদ্ধতার রাষ্ট্র গঠনে বেশি আগ্রহী ছিল। সার্বরা স্বপ্ন দেখছিল যে সব সার্ব নাগরিক তাদের নিজস্ব একটি বৃহৎ রাষ্ট্রে বসবাস করবে।

১৯৯১ সালের জুনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার বেলগ্রেড সফর করে ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়াকে সতর্ক করলেও ততক্ষণে যুগোস্লাভিয়ার বিভাজন শুরু হয়ে যায়। এর পরপরই ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর জবাবে যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী স্লোভেনিয়ায় হামলা চালালেও পরে পিছু হটে।

তবে যুগোস্লাভিয়া ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, কারণ সেখানে বিপুলসংখ্যক সার্ব বসবাস করত। এই সার্ব সংখ্যালঘুদের রক্ষার অজুহাতে ১৯৯১ সালের জুলাইয়ে ক্রোয়েশিয়ায় আক্রমণ শুরু করে যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী। এই অভিযানের মাধ্যমে তারা ক্রোয়েশিয়ার এক-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে নেয় এবং সেখানে 'সার্বিয়ান ক্রাজিনা প্রজাতন্ত্র' দাবি করে। তখনই সার্বদের মনে বলকান অঞ্চলে 'গ্রেটার সার্বিয়া' গঠনের চরম আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে।

বসনিয়ায় যুদ্ধের সূত্রপাত

ইউরোপীয় দেশগুলো ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতাকে তড়িঘড়ি স্বীকৃতি দেওয়ার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা প্রথমে বুঝতে পারেনি। মার্কিন কূটনীতিক সাইরাস ভ্যান্স তৎকালীন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যান্স-ডিয়েট্রিচ গেনশারকে সতর্ক করেছিলেন যে, এই স্বীকৃতির ফলে বসনিয়ায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল। নিয়ম অনুযায়ী সার্বদের নিরীকরণ করার কথা থাকলেও তারা শুধু তাদের সামরিক পোশাক বদলে পুলিশের পোশাক পরেছিল, যার ফলে অস্ত্রগুলো তাদের হাতেই রয়ে যায়।

১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বসনিয়ায় স্বাধীনতার ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বসনিয়ার মুসলিম ও ক্রোয়াটরা স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিলেও সার্ব নেতৃত্ব এই গণভোট বয়কটের ডাক দেয়। ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে বসনিয়ান সার্ব মিলিশিয়ারা রাস্তাঘাটে ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল শুরু হয় সারায়েভো অবরোধ। একের পর এক শহরের পতন হতে থাকে এবং শুরু হয় বসনীয় মুসলিমদের ওপর সার্বদের বর্বর নির্যাতন।

সাংবাদিক ডেভিড রিফ লিখেছেন, এটিকে যুদ্ধ বলা আসলে সত্যের অপলাপ এবং সার্বদের অপরাধকে আড়াল করার শামিল। এটি ছিল স্রেফ একতরফা গণহত্যা। যুদ্ধের আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বে কোনো উসকানি বা যুদ্ধপ্রস্তুতি না থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য চরম বিপর্যয় নেমে আসে।

প্রতিবেশীর হাতেই চরম বিশ্বাসভাতকতা

যুদ্ধের শুরুতেও বসনিয়ার মুসলিমরা জাতিগত বা ধর্মীয় পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা সহাবস্থানে বিশ্বাস করত। কিন্তু তারা ভাবতেও পারেনি যে, একদিন তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও পরিচিত সার্বরাই তাদের দিকে বন্দুকের নল তাক করবে।

এই গণহত্যার শিকার এক নারী প্রামাণ্যচিত্রে তার ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ১৯৯২ সালে যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তিনি বলেন, "১৯৯২ সালের এপ্রিলে সার্বরা আমাদের গ্রামের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। মে মাসের এক রাতে হঠাৎ গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। একদিন সকালে আমি ও আমার ফুফু খাবারের খোঁজে যখন বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম দুজন সশস্ত্র সেনা আমাদের দিকে আসছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ওরা অন্য কেউ নয়, আমাদেরই সার্ব প্রতিবেশী।" এরপর তার ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।

স্রেব্রেনিৎসার আরেক বাসিন্দা খাদিজা মুহাম্মাদোভিচ বলেন, "১৯৯২ সালের ১৭ এপ্রিল আমরা দেখলাম সার্বরা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের অনেক সার্ব বন্ধু থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের কিছুই জানায়নি। টেলিভিশনে হত্যার দৃশ্য দেখলেও আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে যুদ্ধ আমাদের স্রেব্রেনিৎসাতেও পৌঁছাতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দানবেরা চলেই এল।"

জাতিসংঘের ব্যর্থতা ও চূড়ান্ত নিধনযজ্ঞ

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সার্ব মিলিশিয়াদের অবরুদ্ধ করে রাখা স্রেব্রেনিৎসার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সার্বিয়ার সরাসরি সহায়তায় তিনটি সার্ব বিভাগ ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলে স্রেব্রেনিৎসা হয়ে ওঠে চারপাশের তাড়া খাওয়া মুসলিম উদ্বাস্তুদের শেষ আশ্রয়স্থল। শহরের জনসংখ্যা মুহূর্তের মধ্যে ৪০ হাজারে গিয়ে পৌঁছায়। খাদ্য ও ওষুধহীন সেই অবরুদ্ধ শহরে মানুষ ক্ষুধায় ও অবিরাম বোমাবর্ষণে মারা যেতে থাকে।

লাশ আর উদ্বাস্তুদের ভিড়ে স্রেব্রেনিৎসা যখন স্থবির, তখন জাতিসংঘ শহরটিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক অঞ্চল এবং তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের আশ্বাসে বসনিয়ার যোদ্ধারা তাদের অস্ত্র জমা দেয়। কিন্তু শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেই সার্বরা প্রতিদিন শহরে নির্বিচারে শেল ছুড়তে থাকে।

১১ জুলাই ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসা আবারও সার্বিয়ান ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের গোলার আঘাতে কেঁপে ওঠে। অস্ত্রহীন বসনীয় মুসলিমদের রক্ষায় জাতিসংঘ এগিয়ে আসেনি। প্রায় ২০ হাজার মানুষ পোটোচারিতে অবস্থিত জাতিসংঘের ঘাঁটির দিকে ছোটেন আশ্রয়ের আশায়। আর বাকি ১৫ হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে রওনা হন।

মুহাম্মদ হুজদিক হুদজিচ জানান, জাতিসংঘের পোশাক পরে সার্ব সেনারা উদ্বাস্তুদের আলাদা করছিল এবং পুরুষদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসিদের কায়েম করা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো। মুহাম্মদ ও তার ভাই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সেদিন কোনো পুরুষই সার্বদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

স্রেব্রেনিৎসার এই নির্মম গণহত্যায় আট হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এই অঞ্চলের আশপাশে ৪২টি গণকবরের সন্ধান মেলে, যেখান থেকে প্রায় দুই হাজার দেহাবশেষ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও আজও বহু মানুষের হাড়গোড় ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

করণী ফ্যাশনস কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের অভিযোগ করণী ফ্যাশনস কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

কর্মকর্তার ৮ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্ত

বাখরাবাদের ভবন নির্মাণে দুর্নীতি কর্মকর্তার ৮ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্ত

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন দিলীপ ঘোষ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন দিলীপ ঘোষ

সন্তানকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ, গ্রেপ্তার হলেন সেই নারী

সন্তানকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ, গ্রেপ্তার হলেন সেই নারী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App