সর্বদলীয় ক্যাডার বাহিনী পুষতেন রুহুল আমিন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৪৭ এএম
ট্যাক্সিটালক থেকে কোটিপতি বনে গেছেন নুসরাত হত্যার নেপথ্যের কারিগর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন। ‘সর্বদলীয় ক্যাডারবাহিনী’ গড়ে সোনাগাজী উপজেলায় তিনি কায়েম করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। তার অত্যাচারে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি ফয়েজুল কবির। সাবেক এমপি রহিম উল্যাহর বালুমহল দখলে নিয়ে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির সাম্রাজ্য কায়েমে রুহুল আমিনকে নেপথ্যে থেকে সমর্থন দিয়েছেন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খোকন। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগও ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। তবে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পর মুখ খোলছেন সবাই।
সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের কুচিয়া ঘোনা কেরানীবাড়ীর কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন। তার বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আবুল কাশেম স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আরেক ভাই আবু সুফিয়ানও আমেরিকায় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
বিএনপির মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ, ক্ষমতার ভাগ নিতে করেছেন জাতীয় পার্টিও। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করেন। এক সময় পেটের তাগিদে সৌদি আরব গিয়ে ট্যাক্সি চালিয়েছেন রুহুল আমিন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে রুহুল আমিন দলের সর্বশেষ কাউন্সিলে সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় সাবেক এমপি হাজি রহিম উল্লাহর সঙ্গে সদরের সাংসদ নিজাম হাজারীর দ্বন্দ্ব শুরু হলে তিনি নিজাম হাজারীর হয়ে দফায় দফায় হাজি রহিমের গাড়িবহর, বাড়ি, বালূ মহল ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান। ওইসব হামলায় নিহত হয়েছে চরদরবেশ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিন, যুবলীগ নেতা আজিজুল হক, মঙ্গলকান্দির যুবলীগ নেতা নুরুজ্জামান লিটন, মিজানুর রহমান পিসি মিজান প্রমুখ।
সূত্র জানায়, কমিটির তালিকায় ঘঁষামাজা করে রুহুলকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির করা হয়। এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন নির্বাচিত সভাপতি ফয়েজুল কবির। এরপর নিজাম হাজারীর সহযোগিতায় রুহুল আমিন সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি হন। এ ব্যাপারে উপজেলা সভাপতি হিসেবে ফেনী জেলা পরিষদে প্রথমে সদস্য ও পরে প্যানেল চেয়ারম্যান ফয়েজ কবির বলেন, আমি পদত্যাগ করিনি, আবার আমাকে বাদও দেয়া হয়নি। তাহলে অন্য কেউ কীভাবে এ পদের পরিচয় দিতে পারে তা বোধগম্য নয়।
এদিকে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর রুহুল আমিনের ত্রাসের রাজত্বের বিস্তার ঘটে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির পাশাপাশি বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নেয় রুহুল আমিন। এসবের মাধ্যমে তিনি এখন কোটিপতি।
এদিকে ত্রাসের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে যুবদল-ছাত্রদলের পাশাপাশি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশের ক্যাডারদের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ক্যাডার বাহিনী’ গঠন করে পুরো উপজেলার নিয়ন্ত্রণ নেয় রুহুল আমিন। ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্পে সোনাগাজীর অংশের একটি বালু মহাল ও ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট এলাকায় আরেকটি বড় বালু মহাল দখল করেন তিনি।
সোনাগাজী উপজেলার পশ্চিম চরচান্দিয়া এলাকায় ছোট ফেনী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সাহেবের ঘাট ব্রিজ এলাকায় ইজারা এলাকার বাইরে বালু উত্তোলনের অভিযোগে গত বছর ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরীন ফেরদৌসী অভিযান চালায়। সে সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে ঘটনাস্থলে বালু উত্তোলনকারী কাউকে না পেয়ে ড্রেজার মেশিনটি ধ্বংস করা হয়। ওই ঘটনার পরদিন ফেনীর সোনাগাজীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহেল পারভেজ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরীন ফেরদৌসির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে রুহুল আমিন।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা রুহুলের উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী ও উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলমের। এ ছাড়া চরচান্দিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিয়াসাব, ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক দুলাল ওরফে বাটা দুলাল, ইয়াবা হেলাল, সিরাজ ডাকাত, যুবদল নেতা কাশেম মাঝি, ফকিরবাডীর গোলাপ, খুরশিদের চাচাতো ভাই আব্দুল হালিম সোহেলসহ বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী তার বাহিনীর সক্রিয় সদস্য। রুহুল আমিনের ক্যাডার বাহিনীর হাতে নিপীড়নের শিকার হয়েছে একাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী।
সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনাগাজী পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুনকে সরিয়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সদস্য হন রুহুল আমিন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজের সহযোগিতায় পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি হন তিনি।
নুসরাত হত্যা মামলার আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিনসহ ১৩ থেকে ১৪ জনের নাম উঠে আসে। গত শুক্রবার রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। শনিবার তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
