উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রোগী কমেছে ৮০ ভাগ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২০, ০৯:৩৩ এএম
প্রতীকী ছবি
অদৃশ্য এক ভাইরাস ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা কতটুকু। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে গড়ে ওঠা নামকরা হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোকেও নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে এই ভাইরাস। এই অবস্থায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রটা কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। তবে মহামারি করোনায় মফস্বলের লোকজনদের মধ্যে হাসপাতালবিমুখতাই চোখে পড়ছে বেশি। সিট না পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেঝেতে থেকে রোগীদের চিকিৎসা নেয়ার দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।
রোগী না আসায় অধিকাংশ বেডই ফাঁকা পড়ে থাকছে, বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে ওয়ার্ড। মফস্বলের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোতে গড়ে রোগীর সংখ্যা কমেছে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ। ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমের গতিও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সিএইচসিপি করোনায় আক্রান্ত, আইসোলেশন কিংবা কোয়ারেন্টাইনে থাকায় বন্ধ আছে প্রায় ২০০টির মতো কমিউনিটি ক্লিনিক।
জানা গেছে, অনেক এলাকায় করোনা আক্রান্ত হয়েও ভয় এবং সমাজে হেয় হওয়ার শঙ্কা থেকে হাসপাতালে সেবা নিতে যাচ্ছে না রোগীরা। কারণ উপসর্গ থাকলে তাদের বাড়িতে কিংবা নির্ধারিত আইসোলেশন ইউনিটে রাখা হয়। এতে পরিবারের অন্য সদস্যদের এড়িয়ে চলেন এলাকাবাসী। রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকরা তাদের ভালো করে দেখেন না। যাদের করোনা উপসর্গ আছে তাদের দূর থেকে বলে দেয়া হয় বাড়ি চলে যেতে। অন্য রোগীদেরও ধারে কাছে যাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। তাই তারা হাসপাতালে যেতে আগ্রহী নন। এ অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন অনেকে।
আমাদের সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি মাসুম বাদশাহ জানান, রোগী স্বল্পতার কারণে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ শয্যার পুরুষ ওয়ার্ড বন্ধ করে মহিলা ওয়ার্ডকে দুটি অংশে ভাগ করে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। বহির্বিভাগে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. সোহেল রানা জানান, অন্যান্য সময় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে এলেও করোনাকালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জনে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেকেন্দার আলী মোল্লাহ জানান, হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ৫টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাসপাতালটিতে আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় এখানকার শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীদের জেলা সদর হাসপাতাল ও ঢাকাতে পাঠানো হচ্ছে।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান বকুল জানান, পার্বতীপুরে ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ রোগী ভর্তি থাকত। আর এখন এ সংখ্যা নেমেছে ৮ থেকে ১০ জনে। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে আগে গড়ে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন চিকিৎসা নিতে আসত, এখন তা ৯০ থেকে ১০০ জনে নেমে এসেছে। এই হাসপাতালে ৬ শয্যার একটি আইসোলেশন ইউনিট রাখা হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান হবি জানান, গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও ভর্তি রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বহির্বিভাগেও রোগীরা কম আসছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুজ্জামান সরকার জানান, এই হাসপাতালে আইসোলেশন বেড রয়েছে ২০টি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, দেশের সব সরকারি হাসপাতালের মতো উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও ফ্লু কর্নার করে বা জ্বরের রোগীদের জন্য আলাদা রুমে আলাদা চিকিৎসক দিয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। আর অন্যান্য রোগের জন্য থাকেন আলাদা চিকিৎসক। কিন্তু অনেক উপজেলার চিকিৎসক ও নার্স করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় সেবাকেন্দ্রের কাজ অনেকটাই গতি হারিয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নার্স মো. সাইফুল ভোরের কাগজকে জানান, চিকিৎসক নার্সসহ সব মিলিয়ে এখানে জনবল আছে ১৯ জন। এর মধ্যে দুই জন চিকিৎসক, দুই জন নার্স ও এক জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে সংযুক্তিতে পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন দুই জন। বাকিদের মধ্যে কয়েকজন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ আছেন আইসোলেশনে। অন্যরা রোস্টার ভিত্তিতে কাজ করছেন। রোগীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও গুরুতর অসুস্থ না হলে কেউ এখন আর হাসপাতালে আসতে চায় না।
শরীয়তপুর ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মনীষা সাহা ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার এই পরিস্থিতি শহরের মানুষ যেটুকু সচেতন গ্রামের মানুষ ঠিক তার উল্টো। গ্রামাঞ্চলে এখনো উপসর্গ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা কমেনি। মানুষের সচেতনতা নেই, তাই ভয় বেশি। তারা ভাবে হাসপাতালে গেলেই তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হবে।
উপজেলা পর্যায়ে নমুনা পরীক্ষার সুবিধা এখনো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাস এখন দেশের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই নমুনা পরীক্ষার সুবিধা দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। বাংলাদেশ আসা চীনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও দ্রুত উপজেলা পর্যায়ে নমুনা পরীক্ষার সুবিধা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
সিএইচসিপিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিউনিটির লোকজন একে অপরের পরিচিত এবং একজনের খোঁজখবর আরেকজন রাখেন বলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নিতে আসা লোকের সংখ্যা অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কিছুটা বেশি।
সিএইচসিপি এসোসিয়েশনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. আব্দুর রশিদ ভোরের কাগজকে জানান, সিএইচসিপি করোনা আক্রান্ত হওয়ায় সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকার বিছনারডেক কমিউনিটি ক্লিনিক, হবিগঞ্জের মুক্তাহার কমিউনিটি ক্লিনিক, কুমিগ্রামের রাজীবপুর মোহনগঞ্জ এলাকার আব্দুল মজিদ কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম এখন পুরোপুরি বন্ধ। এছাড়া সারা দেশের প্রায় ২০০’র মতো সিএইচসিপি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যেসব কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন সেই সব কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা কার্যক্রম এখন বন্ধ আছে।
সিলেটের বাহুবল উপজেলার দাসপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মনীষ দেব ভোরের কাগজকে জানান, আগে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী সেবা নিতে এলেও এখন তা কমে ঠেকেছে ১০ থেকে ১৫ জনে। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে অনেকে তথ্য গোপন করছেন। ফার্মেসি থেকে জ¦র ও সর্দির ওষুধ কিনে খাচ্ছেন তারা।
তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে চর ও হাওড় অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বাহুবলের হাওড়বেষ্টিত এলাকার হাজীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. লতিফ জানান, হাওড় পাড়ি দিয়ে এখন মানুষ উপজেলা কিংবা সদর হাসপাতালে যেতে চায় না। আর করোনা ভাইরাস নিয়ে অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণাও আছে। অনেকে একে এইচআইভির মতো গোপন রোগ মনে করছেন। তারা কমিউনিটি ক্লিনিকেই আসে। করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারের নির্দেশ মতোই তাদের পরামর্শ ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে।
কমিউনিটি বেইজ হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) লাইন ডিরেক্টর ডা. সহদেব চন্দ্র রাজবংশী বলেন, বর্তমানে দেশে ১৩ হাজার ৮৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। আরো ১ হাজার ২৯টি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। করোনা এই দুর্যোগে বসে নেই কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরাও। সাধ্যমতো মানুষের পাশে থেকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা।
