জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব
পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর-আগুনে সম্পূর্ণ অচল বিআরটিএর কার্যক্রম
দেব দুলাল মিত্র
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর-আগুনে সম্পূর্ণ অচল বিআরটিএর কার্যক্রম। ছবি: ভোরের কাগজ
বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও আগুনে অচল হয়ে পড়েছে রাজধানীর বনানীর বিআরটিএ প্রধান কার্যালয় ও মিরপুর বিআরটিএ অফিস। পনেরো তলা বিশিষ্ট বিআরটিএ ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুনে পাঁচতলা পর্যন্ত সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভবনের নিচে ৪ তলা বেজমেন্টে ঘুরে ঘুরে সন্ত্রাসীরা লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। গেটের পাশের রিসিপশন ও ওয়েটিং রুমের মালামাল লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
মূল ভবনের নিচের তিনটি বেজমেন্টসহ পুরো এলাকার বাতাসে শুধুই পোড়া গন্ধ। বেজমেন্ট থেকে শুরু করে ভবনের সর্বত্র ধ্বংসস্তূপ। এদিকে মিরপুর-১০ নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়েও হামলা চালিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়া হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে একটি বাসসহ ৩টি গাড়ি। ভবনের সামনের দিকে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। গত ১৯ জুলাই এই দিনে বিআরটিএর দুটি কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিআরটিএ ভবনে হামলাকারী ও তাদের তাণ্ডব দেখে মনে হয়েছে- এই হামলা ছিল পরিকল্পিত। তারা প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল। তাদের দেখে শিক্ষার্থী বলে মনে হয়নি। তাদের মুখে ছিল সরকারবিরোধী রাজনৈতিক স্লোগান।
বনানী বিআরটিএ ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য মোকসেদ ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ১৯ জুলাই দুপুরে জুমার নামাজের পর কয়েকটি পিকআপে করে ও পায়ে হেঁটে হামলাকারীরা মহাখালীর দিক থেকে বিআরটিএ ভবনের সামনের রাস্তায় আসে। তারা সরকারবিরোধী নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমেই হামলাকারীরা সঙ্গে করে নিয়ে আসা রেললাইনের পাথর ভবন লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকে। আমরা হঠাৎ এ ধরনের হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এ ধরনের হামলায় আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। আমরা ওইদিন ৮ জন আনসার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম। আমরা সবাই অস্ত্র হাতে নেই।
তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম অস্ত্র দেখলে কেউ ভেতরে ঢোকার সাহস পাবে না। কিন্তু কয়েকশ হামলাকারী বিআরটিএ ভবনলাগোয়া পাশের ফুট ওভারব্রিজ ও দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা ভেতরে প্রবেশ করেই ভাঙচুর শুরু করে। একটি দল মূল গেট উপড়ে ফেলে দেয়। হামলার মুখে একপর্যায়ে আমরা এবং কয়েকজন অফিস স্টাফ ভবনের ১১ তলায় উঠে যাই। ততক্ষণে ভবনের ভেতরে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে। আগুনের তাপে আমরা একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে ভবনের পেছন দিকের সুয়ারেজ পাইপ বেয়ে বনানী আবাসিক এলাকার ভেতরে গিয়ে আত্মরক্ষা করি।
মোকসেদ আরো বলেন, নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে আমরা ফায়ার সার্ভিসে ফোন করি। স্যারদেরও ফোন দিয়েছি। হামলাকারীদের বাধার মুখে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারেনি। হামলাকারীদের ছাত্র বলে মনে হয়নি। হামলাকারীরা বিআরটিএ ভবনের ভেতরে ও সামনে থাকা ৮ থেকে ১০টা গাড়ি ও ৩টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে।
বিআরটিএ ভবনের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায় শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন। ভবনের নিচে মোট চারটি বেজমেন্ট ফ্লোর রয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। বেজমেন্টটিতে ভবনের পেছন দিক থেকে ঘুরে প্রবেশ করতে হয়। হামলাকারীরা তৃতীয় বেজমেন্টেও পৌঁছে গাড়ি খুঁজে খুঁজে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। দ্বিতীয় ও এক তলার বেজমেন্টেও কয়েকটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে ভবনের নিচতলার বঙ্গবন্ধু কর্নার, সাভার রুম পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেছে। দোতলার সব রুম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে ভবনের ৫ তলা পর্যন্ত লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে ভবনের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নতুন করে করতে হবে। এই ভবনটি মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই কার্যালয়ের সব কাগজপত্র আগুনে পুড়ে গেছে। রেকর্ড রুমে কোনো কাগজপত্র অক্ষত নেই।
অপরদিকে মিরপুর ১০ নম্বরের বিআরটিএ কার্যালয়টিও হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। শত শত হামলাকারী এই কার্যালয়ে প্রবেশের দুটি গেটের উপর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর হামলাকারীরা একদিকে লুটপাট চালায়, অন্যদিকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে পুরো কার্যালয়টিকে নরকে পরিণত করে। এই কার্যালয়ের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার মেশিন, ট্যাক্স-টোকেন মেশিনসহ সামনে থাকা সব মেশিন ভাঙচুরের পর জ¦ালিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানকার অনেক জিনিসপত্র হামলাকারীরা লুটপাট করে নিয়ে গেছে। সামনে থাকা একটি বাসসহ তিনটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের রেকর্ড ফাইল ও গুরুত্বপূর্ণ সব নথি হামলাকারীরা তছনছ করেছে। এগুলো আর পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কর্মকর্তারা জানান, এই অফিসের কার্যক্রম সহজেই শুরু করার মতো অবস্থা নেই। ড্রাইভিং পরীক্ষা নেয়া, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া, রেকর্ড সংরক্ষণ করার কোনো ব্যবস্থাই এখন সচল নেই। প্রতিটি বিভাগে হামলাকারীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯ জুলাই সন্ধ্যার পর এই কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ফুট ওভারব্রিজে আগুন দেয়ার পর বিআরটিএ কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকা সকাল থেকেই উত্তাল ছিল। এখান থেকে গিয়ে শত শত হামলাকারী আচমকা বিআরটিএ অফিসে হামলা চালায়। তারা প্রথমে বাইরে থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ইটপাটকেলের মুখে নিরাপত্তা কর্মীরা সেখানে দাঁড়াতে পারেনি। তারা ভেতরের দিকে ভবনের কাছে এসে অবস্থান নেয়। হামলাকারীরা গেট ধরে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। হামলাকারীদের বেশ কয়েকজন গেটের উপর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তখন নিরাপত্তা কর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে কার্যালয়ের পেছন দিকে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে বিআরটিএ চত্বরের বাইরে বেরিয়ে যায়।
তিনি বলেন, হামলাকারীরা লাঠি, লোহার রড, ধারালো রামদা হাতে হামলা চালায়। সামনের শেড ও মেশিনগুলো ভেঙে চুরমার করে ফেলে। ভবনের সামনের চত্বরে থাকা একটি বাস ও অন্য দুটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর তারা ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। ভবনের সামনের দিকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে লুটপাট ও ভাঙচুর চালাতে থাকে। হামলাকারীরা ভবনের মালামাল সবই ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। এখানে আগুন দেয়নি। চেয়ার, টেবিল, আসবাব ভেঙে ফেলেছে। কম্পিউটার, পিসি ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুট করে নিয়ে গেছে।
তারা বলেন, মেশিনপত্র পুনঃস্থাপন না হওয়া পর্যন্ত ফিটনেস পরীক্ষা ও কাগজপত্র দেয়া সম্ভব হবে না। মিরপুর-১০ নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে জমা দেয়া হবে। পরবর্তীতে প্রধান কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।
