সিন্ডিকেট ভাঙতে এলপিজির বাজারে আসছে বিপিসি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক গ্যাস সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কার্যত বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় এলপিজির বাজারে সরকারি উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমানে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে মোংলা ও এলেঙ্গায় নতুন এলপিজি বোটলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেড় বছরের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে এলপিজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতের গ্যাস সংকট বিবেচনায় সরকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্প বাতিল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭ লাখ ৫০ হাজার প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন এবং প্রায় ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার নতুন গ্যাসলাইন নির্মাণের প্রকল্প। এসব খাতে ব্যয় না করে এলপিজি অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মুহাম্মদ সাইদুল হাসান জানিয়েছেন, ঢাকায় গ্যাসের সরবরাহ ক্রমাগত কমছে এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। প্রতিবছরই তিতাস সিস্টেমে গ্যাসের সরবরাহ কমে আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আবাসিক, বাণিজ্যিক, সিএনজি স্টেশন এবং কিছু শিল্প গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। আগে আমিনবাজার, টঙ্গী, ডেমরা ও কদমতলী হয়ে ঢাকায় যে পরিমাণ গ্যাস আসত, বর্তমানে তা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
এই সংকটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও স্পষ্ট। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী জানান, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রাত জেগে রান্না করতে হচ্ছে। একইভাবে এক সাবেক অতিরিক্ত সচিব অভিযোগ করেন, তার বাসায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যায় না।
শিল্প খাতেও গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়াকে এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে আগের বছরে এই পরিমাণ ছিল ১৮০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজিসহ দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণও কমেছে। ২০২৩ সালে দৈনিক সরবরাহ ছিল ২৭৭ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট, ২০২৪ সালে ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৫ সালে ২৭০ কোটি ৬০ লাখ এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ২৫৬ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে।
তিতাস গ্যাস কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি দৈনিক ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পেলেও ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৪ কোটি ১০ লাখ ঘনফুটে।
বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বাকি এলপিজি ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করলেও আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৮ থেকে ১০টি কোম্পানি। ফলে বাজারে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছে সরকার।
এই পরিস্থিতিতে বিপিসি মোংলায় ৬ দশমিক ৫ একর এবং এলেঙ্গায় ৭ একর জমিতে নতুন এলপিজি বোটলিং ও সংরক্ষণাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে বছরে ১২ লাখ টন সক্ষমতার একটি ল্যান্ডভিত্তিক এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই এলাকায় জাহাজ থেকে জাহাজে (এসটিএস) এলপিজি স্থানান্তরের সুবিধাসহ একটি ভাসমান টার্মিনালও নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এলাকায় ২৫ হেক্টর জমিতে আরও একটি ১২ লাখ টন ধারণক্ষমতার এলপিজি সংরক্ষণ টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
